খুলনা ও দিনাজপুরে বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত তিনটি পাটকল ইজারা নিতে যাচ্ছে দেশের শীর্ষস্থানীয় দুই শিল্পগোষ্ঠী প্রাণ-আরএফএল ও হ্যামকো গ্রুপ। এসব মিলে তৈরি পোশাক, জুতা, খেলনা, আসবাব, বৈচিত্র্যময় পাটপণ্য এবং লিথিয়াম ব্যাটারি উৎপাদনের লক্ষ্যে মোট ১ হাজার ৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছে প্রতিষ্ঠান দুটি। এই বিনিয়োগের ফলে প্রায় ১৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) মুখ্য পরিচালন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. মামনুর রশিদ জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) ইজারা সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক চুক্তি সম্পন্ন হবে। এর আগে গতকাল সোমবার তিনি এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
বিগত বছরগুলোতে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো ক্রমাগত লোকসানের মুখে পড়েছিল, যদিও বেসরকারি পাটকলগুলো মুনাফা অর্জন করছিল। লোকসানের চাপ সামলাতে না পেরে ২০২০ সালের ১ জুলাই ২৫টি পাটকল বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। ওই সময় ২৪ হাজার ৮৮৬ জন স্থায়ী শ্রমিককে স্বেচ্ছা অবসর (গোল্ডেন হ্যান্ডশেক) প্রকল্পে পাঠানো হয়। বন্ধ হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ২২টি ছিল পাটকল এবং ৩টি নন-জুট কারখানা।
পাটকলগুলো বন্ধের পর সেগুলো বেসরকারি খাতে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেয় তৎকালীন সরকার। এখন পর্যন্ত বিজেএমসি ১৪টি পাটকল বেসরকারি খাতে ইজারা দিয়েছে, যার মধ্যে ৯টি উৎপাদনে ফিরে এসেছে। এসব কারখানায় বর্তমানে সাড়ে ৯ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে বলে বিজেএমসি সূত্রে জানানো হয়েছে।
এই ইজারা প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে খুলনার দিঘলিয়ার স্টার জুট মিলস ও সিরাজগঞ্জের রায়পুরের জাতীয় জুট মিলস ইজারা পাচ্ছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটি দুটি কারখানায় প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে, যেখানে কর্মসংস্থান হবে সাড়ে ১১ হাজার মানুষের। অন্যদিকে, খুলনার খালিশপুরের প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিল ৩০ বছরের জন্য ইজারা পাচ্ছে হ্যামকো গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান আবদুল্লাহ ব্যাটারি কোম্পানি (প্রাইভেট) লিমিটেড।
১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত স্টার জুট মিলসের ৫৬ একর জমির মধ্যে প্রায় ৪৬ একর ইজারা নেবে প্রাণ-আরএফএল। সেখানে উচ্চমূল্যের পাটজাত পণ্য, আসবাব ও মিডিয়াম ডেনসিটি ফাইবার (এমডিএফ) বোর্ড উৎপাদনে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে, যা থেকে ৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য, কারখানা থেকে বার্ষিক ৫০০ কোটি টাকার পণ্য বিক্রি করা।
সিরাজগঞ্জের জাতীয় জুট মিলসের ৭৫ একর জমির মধ্যে প্রায় ৩৮ একর পাবে প্রাণ-আরএফএল। সেখানে তৈরি পোশাক, হস্তশিল্প, ব্যাগ, জুতা ও খেলনা উৎপাদন কারখানা এবং কাঁচামাল, প্যাকেজিং ও সংরক্ষণাগার নির্মাণে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এই কারখানায় সাড়ে ৬ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে এবং বার্ষিক লেনদেনের লক্ষ্যমাত্রা ৬০০ কোটি টাকা।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল জানান, দেশীয় বাজারের পাশাপাশি রপ্তানির জন্যও পণ্য উৎপাদন করা হবে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই উৎপাদন শুরু হবে। তিনি উল্লেখ করেন, জমি ক্রয় করে কারখানা নির্মাণে সাধারণত তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগে, কিন্তু প্রস্তুত জমি পেলে দ্রুত উৎপাদনে যাওয়া যায় এবং সময় ও অর্থ দুটোই সাশ্রয় হয়।
উল্লেখ্য, এর আগে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত রাজশাহী টেক্সটাইল মিল এবং রাজশাহী জুট মিল সরকারি-বেসরকারি যৌথ অংশীদারত্বে (পিপিপি) চালু করেছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। ওই দুটি কারখানায় বর্তমানে সাড়ে তিন হাজার মানুষ কাজ করছেন, যা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে।
১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলের প্রায় ৫৬ একর জমির মধ্যে প্রায় ৫০ একর পাচ্ছে হ্যামকো গ্রুপ। তারা সেখানে ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে দুটি কারখানা স্থাপন করবে, যাতে কর্মসংস্থান হবে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মানুষের। একটি কারখানায় পাটের বিশেষায়িত ম্যাট্রেস উৎপাদন হবে, যা চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে তৈরি হয়ে বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হবে। অপর কারখানায় লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি উৎপাদন করা হবে, যার জন্য বিদেশ থেকে সেল আমদানি করা হবে।
হ্যামকো গ্রুপের কোম্পানি সচিব রেজাউল করিম জানান, বিজেএমসি তিন মাসের মধ্যে বন্ধ পাটকলটি বুঝিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। এরপর কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু হবে এবং এক বছরের মধ্যে দুটি কারখানাই চালু করার প্রত্যাশা রয়েছে। উল্লেখ্য, ১৯৮৬ সালে আবদুল্লাহ ব্যাটারি কোম্পানি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে হ্যামকো গ্রুপের যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে প্লাস্টিকের গৃহস্থালি পণ্য, আসবাবপত্র, রান্নার সামগ্রী, চামড়া ও স্পোর্টস জুতা, টায়ার এবং বৈদ্যুতিক পণ্যে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছে গ্রুপটি।




