ব্যবসায়িক বিশ্ব যেন আগে কখনো প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়নি, এমন ভঙ্গিতে বর্তমানে কৃত্রিম-বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে আলোচনা চলছে। অথচ প্রতিটি প্রজন্মই কোনো না কোনো যুগান্তকারী উদ্ভাবন দেখেছে, যা কোম্পানিগুলোর পরিচালনা, প্রতিযোগিতা ও প্রবৃদ্ধির পদ্ধতি বদলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। বাউশ অ্যান্ড লম্বের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রযুক্তি বদলালেও করপোরেট প্রতিক্রিয়ায় এক বিস্ময়কর পরিচিতি লক্ষ্য করা যায়। কোম্পানিগুলো দ্রুত নতুন সিস্টেম কিনতে, বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দিতে ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী রূপান্তর পরিকল্পনা ঘোষণা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তারা কোন প্ল্যাটফর্ম নির্বাচন করবে, কত দ্রুত তা চালু করতে পারবে এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে কি না — এসবের দিকেই মূলত নজর থাকে। এই উত্তেজনার মাঝে কেবল প্রযুক্তি গ্রহণ করাকেই কৌশল হিসেবে ধরে নেওয়ার একটি সহজাত ভুল হয়ে যায়।
আমরা এর আগেও এমন নানা সংস্করণ দেখেছি। নতুন প্রযুক্তি আসে এই ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে যে তারা প্রতিযোগিতার মানচিত্র পাল্টে দেবে। কোম্পানিগুলো বিপুল বিনিয়োগ করে, নিজেদের সেই প্রযুক্তির চারপাশে পুনর্বিন্যস্ত করে এবং মনে করে যে শুরুর দিকে গ্রহণ করাটাই স্থায়ী অগ্রণী ভূমিকায় রূপ নেবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তির সহজলভ্যতা বাড়ে। প্রতিদ্বন্দ্বীরাও অনেকাংশে একই সক্ষমতা অর্জন করে ফেলে এবং যে বৈশিষ্ট্যগুলো একসময় বৈপ্লবিক মনে হতো, সেগুলো মানক স্তরে পরিণত হয়। ঠিক তখনই কোম্পানিগুলোর মাঝে আসল তফাত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি হাতিয়ার কেনা এবং তা ব্যবহারে সক্ষম একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা — এই দুটির মধ্যে রয়েছে বিশাল পার্থক্য।
এআই সম্ভবত আগের প্রযুক্তিগুলোর চেয়ে বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন, এর গতি দ্রুততর এবং কোম্পানির প্রতিটি শাখায় এর অনুপ্রেশ আরও গভীর হতে পারে। পরিবর্তনের বিশালতা অস্বীকার করছি না। কিন্তু মুল ব্যবসায়িক শিক্ষাটি নতুন নয়: প্রযুক্তি নিজ থেকে স্থায়ী অগ্রগতি বয়ে আনে না। এটা করে মানুষেরা। আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, যে প্রতিষ্ঠান সবার চেয়ে দ্রুত শিক্ষা নেয়, তারাই এ সুবিধা পায়। এআই নিয়ে আলোচনায় বর্তমানে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো এই অংশটিই উপেক্ষা করার ঝুঁকিতে রয়েছে। কোম্পানিগুলো মডেল মূল্যায়ন, বিক্রেতা তুলনা ও নতুন সরঞ্জাম উদ্ভাবনের দৌড়ে আছে। এ সিদ্ধান্তগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শেষমেশ কোন সংস্থা সফল হবে, তা নির্ধারণে এগুলো খুব একটা বড় ভূমিকা রাখবে না। সহজলভ্যতা বাড়তে থাকবে, সক্ষমতা ছড়িয়ে পড়বে আর আজকের যুগান্তকারী উদ্ভাবন আগামীকালের প্রত্যাশিত ফিচার হয়ে দাঁড়াবে।
তা থেকে বড় প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তির বদলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিখে চলার জন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের জনবল কতটা প্রস্তুত। সে কারণেই সিইও মনে করেন, এআই-এর জন্য কোনো কোম্পানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ কেবল প্রযুক্তিতে নয়। এটা হলো এমন একটি কর্মীবাহিনী গঠন, যারা কৌতূহলী, অভিযোজনক্ষম ও কাজের প্রচলিত ধারা নিয়ে চ্যালেঞ্জ করতে প্রস্তুত। এ ধরনের সংস্কৃতি কোনো বিক্রেতার কাছ থেকে কিনে পাওয়া যায় না। সময় নিয়ে তা বানাতে হয়। বাউস-অ্যান্ড-লম্বে কোম্পানি কীভাবে চলে, তার অংশ হিসেবে শেখাকে সংযুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে, কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ আয়োজনের মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। প্রতিষ্ঠানটি গত বছর কর্সেরার সঙ্গে অংশীদারিত্বে একটি এন্টারপ্রাইজ-ওয়াইড এআই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শুরু করেছিল, কারণ তাদের বিশ্বাস, এআই সাক্ষরতা এখন একটি মৌলিক ব্যবসায়িক দক্ষতায় পরিণত হওয়া উচিত, কোনো প্রযুক্তিগত বিশেষ দক্ষতা নয়।
তথ্যভিত্তিক কাজ করা কর্মীদের জন্য এই প্রশিক্ষণকে বাধ্যতামূলক করা হয়। অনেকেই এ সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, যা স্বাভাবিক। বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ সব সময় স্বাগত পায় না, আর কোর্স শেষ করলেই কেউ এআই বিশেষজ্ঞ বনে যায় না। কিন্তু যদি এআই প্রায় সব ব্যবসায়িক কাজকে প্রভাবিত করতে যাচ্ছে, তাহলে এই প্রযুক্তি বুঝ ও কাজে লাগানোর ভিত্তি তৈরি করাটা আর ঐচ্ছিক হয়ে থাকতে পারে না। অবশ্য প্রশিক্ষণ কেবল একটি সূচনাবিন্দু মাত্র। শেখা তখনই মূল্যবান হয়ে ওঠে যখন লো তা কাজে প্রয়োগ করে। নিজেদের ভিশনএআই চ্যালেঞ্জ উদ্বোধন করে কোম্পানির সব জায়গার সহকর্মীদের — শুধু এআই বিশেষজ্ঞ নয় — আমন্ত্রণ জানানো হয় এআই কীভাবে কার্যপদ্ধতি উন্নত করতে পারে, তার ব্যবহারিক উপায় খুঁজে বের করতে। এই চ্যালেঞ্জে উৎপাদন, গবেষণা ও উন্নয়ন, বাণিজ্যিক কার্যক্রম, অর্থায়ন, মানবসম্পদ ও অন্যান্য বিভাগ থেকে নানা আইডিয়া জমা পড়ে। যেটা চোখে লাগার মতো, সেটা হলো পরিধির বিস্তৃতি। কিছু আইডিয়া উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিল, কিছু আইডিয়া ছোটখাটো কিন্তু লেগে থাকা সমস্যা নিয়ে — যেগুলো সময় খেয়ে কাজকে জটিল করে রাখে। এসব আইডিয়া হয়তো শিরোনাম হবে না, তবে এগুলো মিলিয়ে একটি কোম্পানিকে আরও দ্রুতগামী ও কার্যকরী করে তোলে।
এই অভিজ্ঞতা থেকে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছা গেল: যারা কাজের সবচেয়ে কাছের জায়গায় থাকেন, সাধারণত তারাই পরিষ্কার বোঝেন কীভাবে সেটির উন্নতি সম্ভব। নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ হলো, তাদের সেই জ্ঞান, অনুমতি ও সুযোগ দেওয়া, যাতে তারা সেই ব্যাপারে কিছু করতে পারেন। ভালো আইডিয়া যাতে ছড়িয়ে যেতে পারে, তাও সমান জরুরি। আর সেটা করাই হলো এআই ইন অ্যাকশনের মুল লক্ষ্য। এটি একটি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে সহযোগীরা নিজেদের বাস্তব উদাহরণ ভাগ করে নেন কীভাবে তারা সমস্যা সমাধানে, পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ দূর করতে ও গ্রাহক সেবার মান বাড়াতে এআই ব্যবহার করছেন। কিছু উদাহরণে মাসে কয়েক ডজন ঘণ্টা বাঁচে; আবার কিছুতে এক-দুই ঘণ্টা করে। সবকটারই মূল্য আছে — বিশেষ করে যখন একজন ব্যক্তির উদ্ভাবিত সমাধান কোম্পানির অন্য কাউকে একই ধরনের সমস্যার জন্য একটা ভালো পথ দেখায়। সময়ের সাথে এই উন্নতিগুলো জমা হয়। আরও বড় কথা, যেসব মানুষ এইগুলো তৈরি করেন, তারা নিজেরাও সমাধানদাতা ছাড়াও শিক্ষকে পরিণত হন। এটি এআই-পূর্ববর্তী আরেকটি শিক্ষা।
প্রায়শই কোম্পানিগুলো রূপান্তরকে কেন্দ্রীয়ভাবে চালিত কোনো কর্মযজ্ঞ হিসেবে দেখে। একটি ছোট গ্রুপ প্রযুক্তি নির্বাচন করে, প্রক্রিয়া নির্ধারণ করে এবং বাকি প্রতিষ্ঠানকে তা ব্যবহারের নির্দেশ দেয়। কেন্দ্রীয় সমন্বয়ের একটি ভূমিকা আছে, বিশেষ করে যখন বিষয়টা মান, নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীল ব্যবহারের মতো কিছু হয়। কিন্তু সদস্যি স্থায়ী রূপান্তর খুব একটা ঘটে না। যে কোম্পানিগুলো এআই থেকে সর্বাধিক সুবিধা পাবে, তারা হবে সেই সব প্রতিষ্ঠান, যারা সংগঠনের সব জায়গার লোকজনকে দায়িত্বশীল পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নিজেদের শিক্ষা ভাগ করা ও অপরের উন্নতি ঘটানোর জন্য সজ্জিত করে। এর জন্য নেতৃত্বকেও নিজেদের ভূমিকা নিয়ে ভাবতে হবে। বছর ধরে নেতৃত্ত্ব মানেই ছিল সব উত্তর জানা। কিন্তু এখন আমাদের দায়িত্ব হলো এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে মানুষ আরও ভালো প্রশ্ন করতে পারেন। আমাদের পরিষ্কার প্রত্যাশা ও গার্ডরেল স্থাপন করতে হবে, কিন্তু একই সঙ্গে এটা স্বীকারে স্বাচ্ছন্দ্য থাকতে হবে যে এই প্রযুক্তি ঠিক কোন দিকে যাবে, তা এখনো কেউ জানি না।
এআই ক্রমাগত বিবর্তিত হবে। আজকের প্রধান মডেল শেষ পর্যন্ত প্রতিস্থাপিত হবে, আর বর্তমানে অসামান্য মনে হওয়া সক্ষমতাগুলো হবে একদম নিত্যদিনের ব্যাপার। কোনো কোম্পানি নির্দিষ্ট এক সময়ে সঠিক সরঞ্জাম বেছে নিয়েই স্থায়ী সুবিধা নিশ্চিত করে ফেলতে পারে না। যা টিকে থাকতে পারে, তা হলো কৌতূহল, অভিযোজ্যতা ও এমন একটি সংস্কৃতি, যেখানে শিক্ষাকে কাজেরই অংশ ভাবার রীতি গড়ে ওঠে। লোরা প্রায়ই এআই নিয়ে কথা বলেন যেন এটি মানুষের সম্ভাবনা মিশিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু এই প্রযুক্তি সম্ভাবনাকে আরও বিস্তারিত করতে পারে, যখন কোম্পানিগুলো প্লাটফর্ম নির্ধারণের মতোই নিজেদের জনবলকে প্রস্তুত করতেও সমান সময় দেবে। বর্তমানের উন্মাদনা একদিন কমে যাবে, যেমনটা প্রযুক্তির অন্যান্য ঢেউয়ের সময় হয়েছে। এআই তখন আরও বেশি একীভূত, অধিকতর পরিচিত ও ব্যাপকতর সহজলভ্য হয়ে উঠবে। আর যখন তা ঘটবে, তখন অগ্রগতি সেই কোম্পানির দখলে যাবে না যে সর্বপ্রথম সর্বশেষ প্রযুক্তিটি কিনেছিল। বরং তা সেই কোম্পানির হবে, যার কর্মীরা তা দিয়ে কী করা যায় — তা ক্রমাগত শিখে চলবে।




