কানাডায় অবস্থানরত বাংলাদেশি লেখক তামান্না মহুয়া সম্প্রতি দেশে পাঁচ সপ্তাহের ছুটি কাটিয়ে অফিসে যোগ দিয়েছেন। তবে দেশের সফরটি তার জন্য মোটেও সুখকর ছিল না। চাঁদরাতে তার নিকটতম খালার মৃত্যুতে শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই কানাডায় ফিরে আসতে হয় তাকে। ফেরার পরপরই তার ছোট ছেলে জিবরীলের শরীর খারাপ হতে থাকে। অফিসে যোগ দিয়েই তিনি বারবার ফোন করে ছেলের খোঁজ নেন। বিকেলে পারিবারিক চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল। জিবরীল অ্যাজম্যাটিক হওয়ায় লেখকের মধ্যে উদ্বেগ কাজ করছিল। অফিস শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পরই ফোন আসে জিবরীলের অবস্থা গুরুতর, তাকে জরুরি বিভাগে নিতে হবে। দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে লেখক দেখেন ছেলের অক্সিজেন লেভেল কমছে। ভয়, উদ্বেগ আর প্রার্থনার মধ্য দিয়ে তিনি ছেলেকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পৌঁছানোর পর দ্রুত তিনজন নার্স ও চারজন ডাক্তার জিবরীলের চিকিৎসায় নিয়োজিত হন। সঙ্গে সঙ্গেই অক্সিজেন দেওয়া শুরু হয়। চিকিৎসকরা জানান, অ্যাম্বুলেন্সে আনা হলে আরও আগে অক্সিজেন সাপোর্ট দেওয়া সম্ভব হতো। ক্রমাগত মনিটরিং, আইভি মেডিকেশন চলতে থাকে। চিকিৎসকরা জানান, কয়েক ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখা হবে এবং প্রয়োজন হলে তাকে জিম প্যাটিসনের উপরের তলায় ভর্তি করা হবে। মায়ের কষ্ট হলেও সৃষ্টিকর্তার ওপর তার অটল বিশ্বাস ছিল। রাত ২টার দিকে জিবরীলকে তিন তলায় কেবিন নং ২৩২১-এ স্থানান্তর করা হয়। এই কেবিনের বিশেষত্ব হলো জানালা দিয়ে সাসকাচুয়ান নদী, দুটি ব্রিজ, নদীতে থাকা প্রমোদতরি, বিশাল নীল আকাশ ও বনভূমি দেখা যায়। শহরের দৃশ্যটি লেখকের মনকে কিছুটা শান্ত করে।
প্রথম রাতে প্রতি ঘণ্টায় নেবুলাইজেশন ও ভাইটাল পরীক্ষা চলতে থাকে। মা সারারাত জেগে সেবা দেন। দ্বিতীয় দিনে ২৪ ঘণ্টায় ২৪ বার নেবুলাইজ করা হয়। জিবরীলের বন্ধু মিশানসহ সিনথি ভাবী ও সালেহীন ভাই খাবার নিয়ে আসেন। তৃতীয় দিনেও জিবরীলের অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় লেখকের মন খারাপ ছিল। ফজরের সময় নামাজ পড়ে ও অজিফা পড়ে তিনি দোয়া করেন। হাসপাতালের অনলাইনে ভেজিটেরিয়ান খাবার অর্ডার করা হয়। শাশুড়ি ও দেবর এসে জিবরীলকে দেখে যান। চতুর্থ দিনে জানালা দিয়ে সাসকাচুয়ান নদীর শান্ত স্রোত দেখে লেখক নিজেকে নদীর মতো শান্ত ও ধৈর্যশীল হতে বলেন। দুপুরে নার্সরা খেলনা নিয়ে আসেন এবং স্পাইডার ম্যান বেলুন নিয়ে শিশুদের আনন্দ দেয়। পঞ্চম দিনে জিবরীল অনেকটা ভালো বোধ করলেও মাঝেমধ্যে অক্সিজেন লেভেল এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। সিনথি ভাবী হাসপাতালে থাকায় লেখক বাসায় গিয়ে কিছু কাজ সেরে ফিরে আসেন। ষষ্ঠ দিনে সবকিছু স্বাভাবিক হলে চিকিৎসকরা জিবরীলকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তবে ওষুধের ডোজ পরিবর্তন করে আরও কিছুদিন বিশ্রামের পরামর্শ দেওয়া হয়। অবশেষে পড়ন্ত বিকেলে জিবরীল হুইলচেয়ার ছাড়াই মায়ের হাত ধরে লিফটে এসে গাড়িতে ওঠে। হাসপাতালকে হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে তারা বাড়ি ফিরে আসে।


