পড়ন্ত বিকেলে কর্ণফুলী নদীর পাশে বসে দুই তরুণের আলাপচারিতা কানে আসছিল এক লেখকের। সম্প্রতি তাঁদের এলাকায় ঘটে যাওয়া দুটি মর্মান্তিক আত্মহত্যার ঘটনা ঘিরেই ছিল তাঁদের উদ্বেগ। সেই কথোপকথনের সূত্র ধরেই প্রশ্ন জাগে, যে জীবনে মানুষ সুখের জন্য নানামুখী প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, সেই রঙিন জীবন থেকে কেন কেউ নিজেকে সরিয়ে নিতে চান?
ইচ্ছাকৃত আত্মহননের পেছনে একক কোনো কারণ না থাকলেও বিশেষজ্ঞরা একাধিক নির্দিষ্ট পরিস্থিতি চিহ্নিত করেছেন। মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা, যেমন তীব্র বিষণ্নতা, হতাশা ও নিঃসঙ্গতা এ ক্ষেত্রে বড় অনুঘটক। মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতা, বাইপোলার বা সিজোফ্রেনিয়ার মতো ব্যাধিও আত্মহত্যার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
শিক্ষা ও পেশাগত চাপও অনেককে আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়। জিপিএ-৫ অর্জনের মতো পারিবারিক প্রত্যাশা, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার গ্লানি কিংবা বেকারত্বের অনিশ্চয়তা তরুণ প্রজন্মের উপর অসহনীয় মানসিক বোঝা সৃষ্টি করে।
পারিবারিক পরিবেশ ও সামাজিক যোগাযোগের ভূমিকাও এ ক্ষেত্রে অনস্বীকার্য। বাবা-মায়ের অশান্তি, বিবাহবিচ্ছেদ অথবা ঘনিষ্ঠজন থেকে মানসিক সমর্থন না পাওয়া ব্যক্তিকে একাকী করে তোলে। বিদ্যালয়ে বা অনলাইনে সহপাঠীদের দ্বারা কটূক্তি ও ব্ল্যাকমেলিং (সাইবার বুলিং) এবং প্রেমের সম্পর্কে ভাঙন বা প্রত্যাখ্যানও অনেকের জন্য সীমানা পেরোনোর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
শৈশবে বা কৈশোরে শারীরিক, মানসিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হলে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ক্ষত (ট্রমা) তৈরি হয়, যা পরবর্তী জীবনে আত্মহত্যার চিন্তাকে উসকে দিতে পারে। নিকটজনের আকস্মিক মৃত্যু বা বড় কোনো বিপর্যয়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারার ফলও ভয়াবহ হতে পারে।
প্রযুক্তি ও অনলাইন জগতের নেতিবাচক প্রভাব বর্তমানে প্রকট। ভার্চ্যুয়াল দুনিয়ায় অন্যের নিখুঁত জীবন দেখে নিজের সঙ্গে তুলনা করে হীনম্মন্যতা অনুভব করা, অতিরিক্ত ডিভাইস ব্যবহার ও ক্ষতিকারক অনলাইন গেইম বা চ্যালেঞ্জে আসক্তি মানুষকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে।
মাদকাসক্তি আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে ঠেলে দিতে পারে। এছাড়াও অর্থনৈতিক সংকট, তীব্র একাকীত্ব ও পরিচয়সঙ্কটের মতো বিবিধ বিষয় মানুষকে চরমপন্থা বেছে নিতে প্রভাবিত করে।
তবে এই সংকট থেকে উদ্ধার পাওয়ার পথও রয়েছে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে মনের কষ্ট বিশ্বাসী কারো সাথে ভাগ করে নেওয়াই প্রথম ও জরুরি পদক্ষেপ। তীব্র হতাশা বোধ করলে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের (সাইকোলজিস্ট বা সাইকিয়াট্রিস্ট) স্মরণাপন্ন হওয়াটা কোনো লজ্জার বিষয় নয়। আত্মহত্যার তীব্র চিন্তা এলে সঙ্গে সঙ্গে একা না থেকে ঘর থেকে বেরিয়ে মানুষের মাজে যাওয়া বা প্রিয় কোনো কাজে মগ্ন হওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
পারিবারিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতাও এখানে অপরিহার্য। কেউ হঠাৎ চুপচাপ হয়ে গেলে, প্রিয় জিনিস বিলিয়ে দিলে বা ‘মরে গেলেই ভালো হতো’-র মতো কথা বললে সেটিকে অভিনয় হিসেবে উড়িয়ে না দিয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। হতাশগ্রস্থ ব্যক্তির কথা শুনতে হবে বিনা বিচারে ও শুনিয়ে দিতে হবে যে সে একা নয়।
পড়ার জন্য সন্তানের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে পারিবারিক পরিবেশকে এমন রাখতে হবে যেন যেকোনো ভূলের কথাও সে নিঃসংশয়ে বলতে পারে। ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার ভিত শক্ত করাও সহায়ক ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি, ঘরে থাকা বিষাক্ত ওষুধ বা ধারালো অস্ত্র বিষণ্নতায় আক্রান্ত ব্যক্তির নাগালের বাইরে রাখাটাও জরুরি প্রতিরোধমূলক কৌশল।
মানসিক যাতনা যখন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায় এবং পরিস্থিতি কখনো বদলাবে না বলে মনে হতে থাকে, তখনই মানুষ আত্মহত্যার পথ খোঁজে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, এটি সাময়িক মানসিক ঝড় মাত্র। সঠিক সময়ে চিকিৎসা এবং একটু সহানুভূতি বহু মূল্যবান জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে।



