চট্টগ্রামে অব্যাহত ভারী বর্ষণের জেরে এবার মিরসরাই উপজেলার সব ঝরনায় পর্যটকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে বন বিভাগ। গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বারৈয়ারঢালা রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আশরাফুল আলম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ তথ্য জানানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আগামী শুক্রবার অর্থাৎ ১০ জুলাই পর্যন্ত উপজেলার সব কটি ঝরনায় পর্যটকদের যাতায়াত সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। পাশাপাশি এসব ঝরনার ইজারাদারদের সব ধরনের পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মিরসরাইয়ের ঝরনাগুলোর ইজারাদার প্রতিষ্ঠান মেসার্স ‘থ্রি বি’-এর স্বত্বাধিকারী ওহিদুল ইসলাম জানান, বন বিভাগের নির্দেশনা পাওয়ার পরপরই তারা ইজারাভুক্ত সব ঝরনায় পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছেন। তাদের কর্মীরা সার্বক্ষণিক বিষয়টি তদারক করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আশরাফুল আলম জানান, বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলের কারণে ঝরনা এলাকার ঝিরিগুলোতে তীব্র স্রোত তৈরি হয়। দুর্যোগপূর্ণ এই সময়ে অনেক পর্যটক অতি উৎসাহী হয়ে বা পরিস্থিতি বুঝতে না পেরে বিপদে পড়েন। তাই নিরাপত্তার স্বার্থে ১০ জুলাই পর্যন্ত সব ঝরনায় ভ্রমণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এর আগে ভারী বৃষ্টির কারণে বান্দরবানের সব পর্যটনকেন্দ্র এবং রাঙামাটির সাজেক পর্যটনকেন্দ্রেও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের আওতাধীন বারৈয়ারঢালা জাতীয় উদ্যানের প্রায় ২ হাজার ৯৩৫ একর বনাঞ্চলজুড়ে খৈয়াছড়া, নাপিত্তাছড়া, রূপসী, সোনাইছড়ি, ভাওয়াছড়াসহ বেশ কয়েকটি ঝরনা রয়েছে। আকৃতি ও সৌন্দর্যের কারণে খৈয়াছড়া, নাপিত্তাছড়া ও রূপসী ঝরনায় পর্যটকের ভিড় সবচেয়ে বেশি থাকে।
ঝরনাগুলোতে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য ২০১০ সাল থেকে ইজারা প্রথা চালু করেছে বন বিভাগ। চলতি বছরের ২৩ মে থেকে আগামী বছরের ২৪ মে পর্যন্ত এক বছরের জন্য ৪০ লাখ ১০০ টাকায় ঝরনাগুলোর ইজারা পেয়েছে ‘থ্রি-বি’। ইজারার শর্ত অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের কাছ থেকে ২০ টাকা ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছ থেকে ১০ টাকা প্রবেশমূল্য নেওয়া হয়।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সারা বছরই পর্যটকেরা এসব ঝরনায় এলেও বর্ষাকালে পানির প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় ভিড় কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সরকারি ছুটি ও উৎসবের দিনগুলোতে শুধু খৈয়াছড়া ঝরনাতেই দিনে দুই হাজারের বেশি পর্যটক আসেন। ঝরনাগুলোতে পৌঁছাতে পাথুরে ঝিরিপথ ও পাহাড়ি পথ অতিক্রম করতে হয়। এ কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে। অনভিজ্ঞতা, অসতর্কতা এবং ঝরনার চূড়ায় উঠে সেলফি তোলার প্রবণতার কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে।
যেকোনো দুর্ঘটনায় উদ্ধারকাজে এগিয়ে আসে মিরসরাই ফায়ার সার্ভিস। সংস্থাটির তথ্যানুযায়ী, গত ছয় বছরে মিরসরাইয়ের বিভিন্ন ঝরনায় ছোট-বড় ৩৭টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় সাতজন পর্যটক প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন অন্তত ৫১ জন।
দুর্ঘটনা এড়াতে বন বিভাগ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা কয়েকটি সাধারণ নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া বা পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কা থাকলে ঝরনা ভ্রমণ এড়িয়ে চলা উচিত। ঝিরিপথে থাকা ডোবাগর্ত ও পিচ্ছিল পাথর সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অমান্য করে ঝরনার চূড়ায় ওঠা থেকে বিরত থাকতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে দাঁড়িয়ে সেলফি না তোলার পাশাপাশি সম্ভব হলে স্থানীয় গাইড সঙ্গে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সর্বোপরি বন বিভাগ ও ইজারাদারের দেওয়া নির্দেশনা মেনে চলার ওপর জোর দিয়েছেন তারা।




