রাজধানীর যানজট কমাতে ও সড়কে শৃঙ্খলা আনতে ঢাকায় আরও ৫০টি স্বয়ংক্রিয় (এআই) ট্রাফিক সংকেতবাতি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত ১৮ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে ৫০ কোটি টাকা করে মোট ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়।
এই অর্থে রাজধানীর ৫০টি মোড়ে নতুন সিগন্যাল বসবে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতায় ২৮টি স্থানে ব্যয় হবে প্রায় ৫৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ২২টি স্থানে খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ৪৪ কোটি টাকা। দুই সিটি মিলিয়ে মোট ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৯৯ কোটি টাকা; রক্ষণাবেক্ষণের খরচ এতে অন্তর্ভুক্ত নয়। ফলে প্রতিটি সংকেতবাতির পেছনে গড়ে প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয় হবে।
খরচের এই অঙ্ক শুধু বাতি কেনার জন্য নয়। সিগন্যালের খুঁটি, ভিত্তি, স্টিলের বেড়া, বিদ্যুৎ সংযোগ, ট্রাফিক পুলিশের নিয়ন্ত্রণকক্ষ, সড়ক খনন, ক্যামেরা, নিয়ন্ত্রণ বক্স, ট্যাবসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের পেছনেও অর্থ ব্যয় হবে।
কাজটি দুই ভাগে সম্পন্ন হবে। এক অংশ করবে সিটি করপোরেশনের নিয়োজিত ঠিকাদার, অন্য অংশ করবে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। ঠিকাদারের কাজের মধ্যে রয়েছে সিগন্যালের দুই পাশে ৫০ মিটার করে স্টিলের বেড়া নির্মাণ, ট্রাফিক পুলিশের নিয়ন্ত্রণকক্ষ তৈরি, বাতির খুঁটির ভিত্তি ও খুঁটি নির্মাণ, বিদ্যুতায়ন এবং সড়ক খনন বা কাটার কাজ। বুয়েটের দায়িত্বে থাকবে ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থার নকশা প্রণয়ন, সংকেতবাতি, নিয়ন্ত্রণ বক্স, ট্যাব ও ক্যামেরাসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ। পাশাপাশি যানবাহনের চলাচলসংক্রান্ত জরিপও করবে প্রতিষ্ঠানটি।
ডিএনসিসির হিসাব অনুযায়ী, ২৮টি স্থানে পূর্তকাজে ব্যয় হবে প্রায় ৪৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে স্টিলের বেড়া নির্মাণে সর্বোচ্চ ৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা, খুঁটি নির্মাণে প্রায় ৮ কোটি ২১ লাখ, ভিত্তি তৈরিতে প্রায় ৫ কোটি ৭০ লাখ এবং বিদ্যুতায়নে ৪ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ বক্স, সড়ক খনন, ট্রাফিক সাইনসহ অন্যান্য কাজে ব্যয় হবে প্রায় ১৬ কোটি টাকা। এর বাইরে বুয়েটের পরামর্শ ও সরঞ্জাম কেনায় ব্যয় হবে প্রায় ১২ কোটি টাকা।
ডিএসসিসির ২২টি স্থানে পূর্তকাজে ব্যয় হবে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। বুয়েটকে দেওয়া হবে প্রায় ৯ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে এই সিটির ২২টি সিগন্যালে মোট ব্যয় প্রায় ৪৪ কোটি টাকা।
নতুন এই উদ্যোগের আগে গত বছর ঢাকার ২২টি মোড়ে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি সংকেতবাতি বসানো হয়েছিল, যেখানে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১৮ কোটি টাকা। প্রাথমিকভাবে দক্ষিণের ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল ও বাংলামোটর এবং উত্তরের সোনারগাঁও, ফার্মগেট, বিজয় সরণি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও জাহাঙ্গীর গেট মোড়ে এসব সিগন্যাল স্থাপন করা হয়। পরে এসব সংকেতবাতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ক্যামেরা যুক্ত করে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। ডিএনসিসি, ডিএসসিসি, বুয়েট ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) যৌথভাবে এই পরীক্ষামূলক ব্যবস্থার তদারকি করে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এতে যানজট নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া গেছে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারের সার্ক ফোয়ারা এলাকায় দায়িত্ব পালনকারী ট্রাফিক পুলিশ সদস্য ছোটন বড়ুয়া প্রথম আলোকে বলেছিলেন, “আগে গাড়ি থামাতে যুদ্ধ করতে হতো। এখন লাল বাতি জ্বলে উঠলেই থেমে যাচ্ছে। শান্তিতে দায়িত্ব পালন করতে পারছি। তবে ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলো সমস্যা সৃষ্টি করছে।” সিগন্যালে এআই ক্যামেরা চালুর পর চালকেরা এখন জেব্রাক্রসিংয়ের আগেই থামছেন।
নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে সংকেত ভঙ্গকারীদের তাৎক্ষণিক জরিমানা করায় আইন মানার প্রবণতা বেড়েছে। তাঁর মতে, আইনের নিরপেক্ষ ও কার্যকর প্রয়োগ ট্রাফিক ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। তবে নতুন সিগন্যালব্যবস্থা ধাপে ধাপে সম্প্রসারণ করলে ফলাফল আরও ভালোভাবে মূল্যায়ন করা যেত বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর ভাষায়, আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনায় এ প্রযুক্তি প্রয়োজন; পাশাপাশি লেন ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য ট্রাফিক শৃঙ্খলাও নিশ্চিত করতে হবে।
কাজ শুরুর সময় নিয়ে দুই সিটির বক্তব্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রাজিব খাদেম জানান, দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে এবং আগামী সপ্তাহের মধ্যেই কাজ শুরু করা হবে। অন্যদিকে ডিএনসিসির ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী নাঈম রায়হান খান বলেন, দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে; এটি প্রক্রিয়াধীন আছে। প্রক্রিয়া শেষ করে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।
যেসব মোড়ে নতুন বাতি বসবে, তার মধ্যে ডিএনসিসির তালিকায় রয়েছে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, আসাদ গেট, গণভবন, মোহাম্মদপুর থানা, কলেজ গেট, টেকনিক্যাল, মাজার রোড, মিরপুর-১, সনি সিনেমা হল, মিরপুর-১০, মিরপুর-১২, মিরপুর-৬, মিরপুর-১৪, আগারগাঁও, আবহাওয়া অধিদপ্তর, পরিকল্পনা কমিশন, গুলশান ক্লাব, গুলশান আজাদ মসজিদ, গুলশান-১, গুলশানের ডোমিনোজ ক্রসিং, পুলিশ প্লাজা, নিকেতন, তেজগাঁওয়ের পুরোনো আড়ং, শান্তা টাওয়ার, তেজগাঁও-মহাখালী লিংক রোড, বিওয়াইডি শোরুম, রেইনবো ক্রসিং এবং হাতিরঝিল-মগবাজার ক্রসিং। ডিএসসিসির তালিকায় রয়েছে আজিমপুর, নিউমার্কেট, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, ধানমন্ডি-৬, ধানমন্ডি-৭, কলাবাগান, রাসেল স্কয়ার, ধানমন্ডি-২৭, কাঁটাবন, বাটা সিগন্যাল, কাকরাইল, বিজয়নগর, ফকিরেরপুল, দৈনিক বাংলা মোড়, বঙ্গভবন, গুলিস্তান স্কয়ার, জিপিও, পল্টন মোড়, গ্রিন রোড, মগবাজার মোড়, মিন্টো রোড ও অফিসার্স ক্লাব ক্রসিং।
ঢাকার দুই সিটির ট্রাফিক প্রকৌশল বিভাগ, ডিএমপি ও বুয়েট যৌথভাবে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। নতুন সংকেতবাতি স্থাপনের কাজ দ্রুত শুরু হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেছেন।




