আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটায় দেশজুড়ে গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা ইঙ্গিত দিয়েছেন, এ অবস্থা আরও বেশ কিছুদিন বজায় থাকতে পারে। কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত ভাসমান টার্মিনালটি গতকাল শনিবারও সচল করা সম্ভব হয়নি, যার প্রভাব পড়েছে রাজনন্দীর বিভিন্ন গৃহস্থালি ও শিল্পকারখানায়। রাজধানীর কলাবাগান, মোহাম্মদপুর, কাফরুল, কাজীপাড়া, পশ্চিম তেজতুরী বাজার এবং বাড্ডা প্রভৃতি এলাকার বাসিন্দারা চুলা জ্বালাতে না পেরে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। অনেকে মাটির চুলা বানিয়ে লাকড়ির মাধ্যমে রান্নাবান্না সারছেন, আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা ক্রয় করছেন।
দেশে আমদানীকৃত এলএনজি প্রক্রিয়াজাত করে পাইপলাইনে সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে দুটি ভাসমান টার্মিনাল। এগুলোর মধ্যে একটি পরিচালনা করে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি এবং অপরটি পরিচালনার দায়িত্বে আছে দেশীয় কোম্পানি সামিট। গত মঙ্গলবার এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটলে সেখানকার গ্যাস সরবরাহ সম্পূর্ণ স্থগিত হয়ে যায়। তারপর থেকেই এই সঙ্কট তিব্রতর রূপ ধারণ করে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্রে জানা যায়, টার্মিনালটিতে দুটি বয়লার ছিল, যার একটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অপরাপর বয়লারটি যদি চালু করা যায়, তাহলে সরবরাহে আরও ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস যোগ হবে। গত বৃহস্পতিবার থেকে যুক্তরাজ্য ও আরব আমিরাতের বিশেষজ্ঞ দল মেরামত কাজ শুরু করলেও এখনও সেটিকে চালুর উপযোগী করে তোলা সম্ভব হয়নি। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন ও মাইনস) মো. রফিকুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেছেন, “কারিগরি দল কাজ করছে, এখনো চালু করার অবস্থায় আনা যায়নি। আরও সময় লাগতে পারে। তবে নির্দিষ্ট করে সময় বলা যাচ্ছে না।”
সঙ্কটের ফলে সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র বিদ্যুৎ উৎপাদন। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম উৎপাদিত হচ্ছে, যা ব্যাপক বিদ্যুৎ ঘাটতির আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে। এরপর সবচেয়ে বেশি গ্যাস ব্যবহার করে শিল্পাঙ্গন। গৃহহাস্ত্রের রান্নার কাজ ও সিএনজি চালিত পরিবহনের পাশাপাশি এই সব ক্ষেত্রেও ধাক্কা লেগেছে। সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন পড়তে দেখা যাচ্ছে।
পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, দেশের দৈনিক গড় চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট থাকলেও গত বছর থেকে গড় সরবরাহ সীমাবদ্ধ ছিল ২৭০ কোটি ঘনফুটে। দুর্ঘটনার পর বর্তমানে তা আরও কমে গিয়ে ২১৫ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি এক বার্তায় গ্রাহকদের কাছে গভীর দুঃখ প্রকাশ করে জানিয়েছে যে দেশি-বিদেশি কারিগরি দল নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, ঢাকা ও আশপাশের জেলায় গ্যাস বিতরণকারী তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি সর্তক করেছে যে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তাদের আওতায় সব ধরণের গ্রাহকের ক্ষেত্রেই গ্যাসের নিম্নচাপ বজায় থাকবে। গতবার মোহাম্মদপুরের ভোক্তারা মানববন্ধন ও সামাজিক মাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম তামিম পরিস্থিতি সম্পর্কে ইঙ্গিত দেন যে, দেশের গ্যাস খাত দীর্ঘমেয়াদে সুতার উপর ঝুলছিল। তার বক্তব্য অনুসারে, একটি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে গেলে এতটাই গুরুতর প্রভাব পড়ে, যে তা বোধ করে একটি স্থলভাগিক টার্মিনাল স্থাপনের মতো বিকল্প পূর্বপরিকল্পনার অভাবকে সামনে নিয়ে আসে।




