কক্সবাজারের টেকনাফে প্রস্তাবিত ‘সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক’ বাস্তবায়নে গত এক দশক কেটে গেলেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অধরাই রয়ে গেছে। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) অধীনে প্রকল্পটির জন্য ৯৬৭ একর জমি নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু প্রতিকূল প্রকৃতি, বিশেষত সাগরের ভাঙন, পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব ও নির্মাণকাজের শ্লথ গতি প্রকল্পটির অগ্রযাত্রার প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একই চিত্র আরেক প্রকল্পের বেলায়ও দেখা যাচ্ছে। সীমান্তঘেঁষা নাফ ট্যুরিজম পার্কের কাজ নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে বিগত দুই বছর ধরে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। সাবরাংয়ের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে প্রকল্পের সহকারী পরিচালক জুলহাজ আহমদ জানান, এ পর্যন্ত ২৮টি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে ১২০ একর ভূমি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে এবং প্রায় ৪৬ কোটি ডলারের বিনিয়োগের অঙ্গীকার এসেছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, উপকূলরক্ষা বাঁধ ও সীমানা দেয়ালের নির্মাণ কাজ চলমান, এবং সেন্ট মার্টিনমুখী দর্শনার্থীদের জন্য ঘড়ি ভাস্কর্যটির কাছাকাছি একটি স্থায়ী জেটি নির্মাণের পরিকল্পনা এগোচ্ছে।
তবে জনবলের তীব্র সংকট বিশাল এই প্রকল্পের তত্ত্বাবধানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেজা অফিসের মাত্র পাঁচজন কর্মী দিয়ে সেটি পরিচালিত হচ্ছে। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা গিয়াস উদ্দিন জানান, প্রতিদিন গড়ে ৭০০ থেকে ৯০০ পর্যটকের আগমনে স্বল্প জনবল দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত ও পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। বেজার নির্বাহী সদস্য সালেহ আহম্মদ অবশ্য এই পার্ককে আগামী দশকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদানের কথা জানিয়েছেন এবং জেটি চালু হলে সাবরাং থেকে সরাসরি সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ সম্ভব হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন।
অবকাঠামোগত অগ্রগতি শীথিল থাকলেও সাবরাং সৈকতের অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য প্রতিদিনই শত শত ভ্রমণপিপাসুকে আকৃষ্ট করছে। টেকনাফের মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন পাহাড়, সবুজ প্রকৃতি ও বিচের নির্জন পরিবেশ দর্শকদের মুগ্ধ করে। সৈকতের পথের পাশে বাহারি রঙে সাজানো এক হাজারেরও বেশি মাছ ধরার নৌকা পর্যটকদের জন্য ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। টেকনাফ ডিঙিনৌকা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সুলতান আহমদের ভাষায়, পর্যটকদের আনন্দ দিতেই নৌকাগুলোতে এই রঙের প্রলেপ।
গত সপ্তাহের একটি দিনে ঘড়ি ভাস্কর্যটির সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা পর্যটকদের অসন্তুষ্টির কারণ ছিল অচল অবস্থায় থেমে থাকা ঘড়ির কাঁটা, যা বেলা ১১টা ৫ মিনিটেই আটকে ছিল। মূল রাস্তার মোড়টি পরিণত হয়েছে অর্ধশত খোলা জিপগাড়ির অনিয়ন্ত্রিত টার্মিনালে। সেখানে জরুরি প্রয়োজনের জন্য শৌচাগার বা যাত্রীছাউনির মতো মৌলিক সুবিধাগুলোও অনুপস্থিত। ঢাকা থেকে আসা একজন পর্যটক অর্পিতা দাশ মেরিন ড্রাইভের সৌন্দর্য্যের প্রশংসা করলেও কুমিল্লার বাসিন্দা দাউদ আআহমেদ এর হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, দুই বছর আগে আসার পর থেকে পার্কের অগ্রগতি একেবারেই থমকে আছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি সাবরাং ইউনিয়নের সদস্য আবদুস সালাম জানান, ২০২২ সালে কিছু বালু ভরাট এবং বেজা ভবন নির্মাণ ছাড়া বিগত ১০ বছরে উন্নয়নের অগ্রগতি বলতে তেমন কিছুই ঘটেনি। টেকনাফ সদর ইউপির চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান বলেন, দুই বছর আগে দেওয়া জিও ব্যাগের বাঁধ এখন জোয়ারের ধাক্কায় বিলীয়মান। কক্সবাজার হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খানের মতে, বিপুল রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সাগর ভাঙন প্রতিরোধের কাজে দীর্ঘসূত্রতা সামগ্রিক পর্যটনের কাঙ্ক্ষিত উন্নতি ব্যাহত করছে।
অপরদিকে নাফ ট্যুরিজম পার্কের পরিস্থিতিও সুবিধাজনক নয়। ২০২০ সালে মহাপরিকল্পনা অনুমোদিত হলেও মিয়ানমারের রাখাইন সীমান্তের খুব কাছে হওয়া ও সেখানকার অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে জালিয়ারদিয়ায় নির্মীয়মান দেশের প্রথম দ্বীপভিত্তিক এই পর্যটনকেন্দ্রের নির্মাণ কাজ দুই বছর ধরে পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছে।




