রংপুর শহরের ব্যস্ততা শুরু হওয়ার অনেক আগেই ভোরের অন্ধকার কাটিয়ে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন মঞ্জু হোসেন মজনু। তার ঠিকানা রংপুর নগরীর কাচনা তকেয়ারপাড়া এলাকার ১০ নম্বর ওয়ার্ডে। প্রায় চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তিনি হাজির হন রংপুর প্রেসক্লাব চত্বরে। সেখানে বৈদ্যুতিক খুঁটির পাশে বসে পত্রিকার বান্ডিল খুলে সাজাতে থাকেন দিনের সব কাগজ। সকাল হতে না হতেই নিয়মিত পাঠকেরা জড়ো হতে শুরু করেন তার চারপাশে।
কিন্তু গল্পটি শুধু খবরের কাগজ বিক্রির নয়, এটি টিকে থাকারও কাহিনী। যখন ডিজিটাল মাধ্যমের কল্যাণে মানুষ হাতের মুঠোয় অনলাইনে সংবাদ পড়ছে, ছাপা পত্রিকার চাহিদা তলানিতে ঠেকেছে, তখন টানা দুই দশক ধরে এই ব্যবসাকেই আঁকড়ে রেখেছেন ৪৫ বছর বয়সী মঞ্জু। পত্রিকার বদলাই করা টাকাতেই চলে তার ও তার বৃদ্ধা মা আনোয়ারা বেগমের জীবিকা।
আর্থিক অভাবের শিকড় অনেক পুরনো। মাত্র পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করার সুযোগ পান মঞ্জু। পাঁচ ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তৃতীয় এই সন্তানটির বাবা নুর নবী পেশায় ছিলেন সবজি বিক্রেতা। বিশাল সংসারের টানাপোড়েনের জালে অল্প বয়সেই কাজের সন্ধানে নামতে বাধ্য হন তিনি। ২০০৫ সালে যখন তার বয়স মাত্র ২৪, জীবন-জীবিকার তাগিদেই এই পেশায় পা রাখেন মঞ্জু।
ভোর বেলা ঘুম থেকে ওঠা, সাইকেলে প্রেসক্লাব যাওয়া, কাগজ সাজানো, ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করা—এই নিয়মের মধ্যেই কেটে যায় তার দিনের প্রথম পর্ব। পাশাপাশি পরিচিত দোকান ও বিভিন্ন অফিসে পত্রিকা পৌঁছে দেওয়ার কাজও করতে হয়। মঞ্জু জানান, পরিবারের অন্য সদস্যরা আলাদা থাকেন। তিনি বিয়ে করেননি, তাই মায়ের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। বাবা বেঁচে নেই।
একটা সময় ছিল যখন এ কাজ থেকে ভালো রোজগার হত। আজ থেকে এক যুগ আগেও দৈনিক ৭০০ থেকে ১,০০০ টাকা পর্যন্ত লাভ হত। কিন্তু স্মার্টফোন ও দ্রুতগতির ইন্টারনেট মানুষের অভ্যাস বদলে দিয়েছে। বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে অনলাইনে তাজা খবর পাওয়ার কারণে কাগজের পত্রিকার ক্রেতা সংখ্যা কমে গেছে, আর কমেছে প্রচলন। মঞ্জু বললেন, 'আগে ভোরে দাড়িয়ে অনেক মানুষ খবরের জন্য অপেক্ষা করতেন। এখন বেশিরভাগ লোকই মোবাইল স্ক্রিনে খবর দেখেন। কাগজের চাহিদা আর আগের মতন নাই।'
তবুও তিনি এই পথ ছাড়তে চান না। বর্তমানে তার মাসিক আয় দাঁড়ায় ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকার মাঝামাঝি। এই সীমিত অর্থই দিয়েই চালাতে হয় তার ব্যক্তিগত ব্যয়, মায়ের চিকিৎসার ওষুধ, সংসারের খোরাকি ও অন্যান্য খরচ। রোজগার কমে গেলেও পেশা বদলানোর কথা ভেবে উঠতে পারেন না মঞ্জু। কারণ, ছোটবেলা থেকেই এটি তার নেশায় পরিণত হয়েছে, এবং এটাই তার বেঁচে থাকার একমাত্র উপায়।
প্রেসক্লাবের পরিচিত মুখ প্রবীণ সাংবাদিক মাহবুবুল ইসলামের কথায়, ভোর হতে না হতেই মঞ্জু প্রেসক্লাব এলাকায় আসেন। পেশাগত জগতে অনেক পরিবর্তন এসেছে, পাঠকের খবর গ্রহণের ধরণ বদলেছে, কিন্তু মঞ্জুর পরিশ্রম ও কর্তব্যবোধে কোনও বদল আসেনি। তরুণ সাংবাদিক আবদুর রশিদ মনে করেন, অনলাইনের প্রভাবে ছাপানো কাগজের বাজার সঙ্কুচিত হওয়া বাস্তবতা। কিন্তু মঞ্জুর মত মানুষ যেভাবে এই ব্যবসা ধরে রেখেছেন, তা শুধু একজন বিক্রেতার কাহিন নয়; এটি একটি বদলে যাওয়া সময়ের পটভূমিতে টিকে থাকার গল্প।
প্রতিটি নতুন দিনের ভোরের আলো ফুটতে থাকা শহরে যখন অনেকেই মোবাইলের পর্দায় খবর পড়েন, মঞ্জু তবুও তাঁর বিশ্বাস হারাননি। সাইকেলের হাতলে ঝোলানো কাগজের বান্ডিল ও বৃদ্ধা মায়ের মুখপানের দিকে তাকিয়েই তিনি প্রতিদিনের জীবনের যুদ্ধ শুরু করেন।
তার মা আনোয়ারা বেগম ছেলের ত্যাগের কথা আবেগের সঙ্গে ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, মঞ্জু ছোটকাল থেকে কষ্ট করে সংসার টেনে নিয়ছে। বাবা চলে যাওয়ার পর থেকে আমার দেখভালের পুরো ভার ওর ওপর। এখন আয় কমে গেলেও, যা পায় তা দিয়েই আমার ওষুধ, খাওয়া আর ঘর খরচ চালায়। অনেকবার নিজের জন্য কিছু না কিনে আমার চাহিদাটা আগে পূরণ করে। আমি কেবল দোয়া করি, ও ছাড়া আমার আর কেউ নাই।
তথ্যপ্রযুক্তির এই উত্থানের যুগেও নিষ্ঠা ও কর্তব্য বোধের জোরেই মঞ্জু হোসেন মজনু দাঁড়িয়ে আছেন।




