মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গরুর মাংসের বাজার এখন এক অদ্ভুত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে রেকর্ড দামের কারণে খামারিরা আর্থিকভাবে ব্যাপক লাভবান হচ্ছেন, অন্যদিকে এই উচ্চ মূল্যই পুরো শিল্পের অন্যান্য অংশকে চাপে ফেলছে। সম্প্রতি টাইসন ফুডসের প্রধান নির্বাহী ডনি কিং বিনিয়োগকারীদের কাছে গরুর মাংসের বাজারের হালচাল তুলে ধরেন। তিনি স্বীকার করেন, গরুর মাংসের বাজারের পারফরম্যান্স প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি। এই ক্রমবর্ধমান দাম শুধু টাইসনের মতো বড় মাংস প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানকেই সমস্যায় ফেলেনি, পুরো গবাদি পশু শিল্পেই প্রভাব পড়েছে।
মার্কিন শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, গত এক বছরে গরুর মাংসের দাম বেড়েছে ১১.৮ শতাংশ। জুন মাসে এক মাসের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ১.২ শতাংশ। গরুর কিমা মাংসের দাম বছরে ১২.৪ শতাংশ বেড়েছে, আর গরুর রোস্টের দাম আরও বেশি বেড়ে ১৩.৮ শতাংশে পৌঁছেছে। সাধারণত প্রতি দশকে প্রাকৃতিক কারণে গবাদি পশুর সংখ্যা পরিবর্তিত হয়, ফলে মাংসের দামে ওঠানামা দেখা যায়। কিন্তু বর্তমানে গবাদি পশুর সংখ্যা ১৯৫১ সালের পর থেকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এর পেছনে রয়েছে তীব্র খরায় চারণভূমি শুকিয়ে যাওয়া এবং মাংস খেকো পোকার কারণে মেক্সিকো থেকে গবাদি পশু আমদানি সীমিত হয়ে পড়া।
সরবরাহ সংকটের এই সময়ে গবাদি পশু শিল্পের গোড়ায় থাকা কাউ-ক্যাল্ফ খামারিরা সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছেন। এই খামারিরা মূলত মা গরু ও বাচ্চা ক্যালফ পালন করে থাকেন এবং শিল্পের জন্য গবাদি পশুর জোগান দেন। তারা এখন ক্যালফের দাম বাড়িয়ে দিতে পেরেছেন। টেক্সাস এএন্ডএম বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতির অধ্যাপক ডেভিড অ্যান্ডারসনের মতে, ফিডার ক্যালফের দাম বর্তমানে প্রতি হান্ড্রেডওয়েটে ৪৩৭.৪৪ ডলার থেকে বেড়ে ২০২৭ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৪৬৭ ডলারে পৌঁছাতে পারে। ওকলাহোমা স্টেট ইউনিভার্সিটির অ্যাগ্রিবিজনেস অধ্যাপক ডেরেল পিলের ভাষ্য, এই প্রাথমিক পর্যায়ে কাউ-ক্যাল্ফ উৎপাদনকারীরা রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা করছেন।
তবে শিল্পের বাকি অংশগুলোতে চাপ বাড়ছে। ফিডলট খামারিরা, যারা গবাদি পশু জবাইয়ের আগে শেষ কয়েক মাস দানাদার খাবার খাইয়ে দ্রুত মোটাতাজা করেন, তারাও সমস্যায় পড়েছেন। তাদেরকে এখন বেশি দামে গবাদি পশু কিনতে হচ্ছে, অন্যদিকে সার, রাসায়নিক ও সরঞ্জামের ক্রমবর্ধমান খরচের কারণে মুনাফার মার্জিন কমে আসছে। শুল্ক আরোপের ফলে এসব খরচ আরও বেড়েছে বলে জানান পিল। তিনি বলেন, উপরের দিকের প্রায় সবগুলোই মার্জিন নির্ভর ব্যবসা এবং বেশিরভাগ মার্জিনই এখন প্রতিকূল চাপে রয়েছে। ফিডলট খামারিরা কিছু সময় লাভে থাকতে পারলেও ক্রমাগত সংকটের কারণে তাদের পক্ষে পশু জোগাড় করা এবং খামার ভরাট রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। টাইসন ফুডসের মতো মাংস প্রক্রিয়াজাতকারী সংস্থাগুলোও ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। গত সপ্তাহে কোম্পানিটির গরুর মাংস বিভাগে ১৩৮ মিলিয়ন ডলারের পরিচালন ক্ষতি হয়েছে, যেখানে বিক্রির পরিমাণ ১৫.৯ শতাংশ কমেছে এবং দাম বেড়েছে ১২.১ শতাংশ।
এই পরিস্থিতি নিয়ে অধ্যাপক পিলের মতে, কাউ-ক্যাল্ফ খামারি এবং ফিডলট খামারিদের মধ্যে আয়ের এই ব্যবধান শিল্পের চলমান চ্যালেঞ্জের প্রতিফলন। তবে এটি শুধু এই সংকটের জন্য বিশেষ কিছু নয়। পশুর সংখ্যা বৃদ্ধি-হ্রাসের এই চক্র শিল্পেরই স্বাভাবিক অংশ। যখন পশুর সংখ্যা বেশি থাকে, তখন কাউ-ক্যাল্ফ খামারিরা বিক্রির জন্য পশুর আধিক্যে সমস্যায় পড়েন; বিপরীতে, ফিডলট, মাংস প্রক্রিয়াজাতকারী এবং শিল্পের অন্যান্য অংশ তখন বেশি লাভ করে। সময়ের সাথে সাথে সবাই গড়ে সমান পর্যায়ে চলে আসে। কিন্তু বর্তমান চক্রটি বিশেষ, কারণ খরা এবং রোগের মতো বাহ্যিক কারণে এটি আরও তীব্র হয়েছে। পশুর সংখ্যা পুনরুদ্ধার করতে সময় লাগে এবং সংকট গভীর হলে মা গরুর সংখ্যা কম থাকায় প্রক্রিয়াটি আরও কঠিন হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় ধরে টানাপোড়েনের মধ্যে থাকতে হবে। পিলের মতে, এই প্রক্রিয়াটি স্বাভাবিকের চেয়ে ধীরগতির এবং দুই বছর আগেই এটি শুরু হতে পারত, কিন্তু বিভিন্ন কারণে তা হয়নি। ফলে বর্তমান সরবরাহ সংকট ও মার্জিন কাঠামো আরও দীর্ঘায়িত হচ্ছে।




