বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল পুরস্কার নিয়ে ফের একবার শুরু হয়েছে বিতর্ক। ২০২৬ সালের আসরে ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়া স্পেনের অধিনায়ক রদ্রি এই পুরস্কার জিতলেও প্রশ্ন উঠেছে তাঁর যোগ্যতা নিয়ে। নিউইয়র্ক-নিউ জার্সির স্টেডিয়ামে ১৯ জুলাই অনুষ্ঠিত ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলেই ১-০ ব্যবধানে জেতে স্পেন। ট্রফি হাতে পাওয়ার পর পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে রদ্রির নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই গ্যালারি থেকে 'মেসি! মেসি!' ধ্বনি উঠতে থাকে, যা যোগ দিয়েছিলেন শুধু আর্জেন্টাইন সমর্থকরা নন, নিরপেক্ষ দর্শকরাও।

পুরো টুর্নামেন্টে ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসির পারফরম্যান্স ছিল নজরকাড়া। তিনি ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট করে আর্জেন্টিনার ১৯ গোলের মধ্যে সরাসরি ১২টিতে অবদান রেখেছিলেন। একা হাতে দলকে টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন টানা দ্বিতীয় ফাইনালে, যেখানে জিতলে তিনটি গোল্ডেন বলের মালিক হতেন ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড়। অথচ একজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার যিনি পুরো আসরে কোনো গোল বা অ্যাসিস্ট করেননি, তিনি কীভাবে মেসিকে টপকে সেরা হলেন—এটাই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

ফিফার টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপের সাবেক খেলোয়াড়, কোচ ও বিশ্লেষকদের একটি প্যানেল গোল্ডেন বল বিজয়ী নির্বাচন করে। তাদের মতে, রদ্রি ছিলেন চ্যাম্পিয়ন স্পেনের হৃৎপিণ্ড। পুরো টুর্নামেন্ট অপরাজিত থেকে শিরোপা জিতেছে স্পেন, আর অধিনায়ক হিসেবে প্রতিটি ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়েছেন রদ্রি। স্পেনের দমবন্ধ করা পজেশন ও নিয়ন্ত্রণের ফুটবলে তিনি ছিলেন এক অপরিহার্য নিয়ন্ত্রক—যাকে ফুটবল বিশ্লেষকেরা 'মেট্রোনোম' বলেন। তাঁর ছাড়া স্পেনের ভারসাম্যই বজায় থাকত না বলে মত তাদের।

সবচেয়ে বড় পার্থক্য গড়ে দিয়েছে ফাইনাল ম্যাচ। সেদিন স্পেনের মাঝমাঠ মেসির রসদ সরবরাহের সব পথ বন্ধ করে দিয়েছিল। ১১৭ মিনিট পর্যন্ত আর্জেন্টিনা গোলে একটি শটও রাখতে পারেনি—যা বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে রেকর্ড। ইএসপিএনের রেটিংয়ে ফাইনালে মেসি মাত্র ৩ পেয়েছিলেন ১০-এর মধ্যে। আর সেই মেসিকে শিকলবন্দী করায় ফাইনালের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারটাও উঠেছিল রদ্রির হাতে।

গোল্ডেন বলের ভোটে দলীয় সাফল্যকে ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিরোপাজয়ী দলের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে রদ্রি আধুনিক ইতিহাসে দ্বিতীয় ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে এই পুরস্কার জিতলেন। এই প্রক্রিয়ায় শুধু ফরোয়ার্ড বা উইঙ্গার নয়, যাঁরা নীরবে খেলা নিয়ন্ত্রণ করেন তাঁরাও স্বীকৃতি পেতে পারেন বলে মনে করছে ফিফা। তবে রদ্রির এই জয়ের পেছনে রয়েছে এক কঠিন সংগ্রাম। ২০২৪ সালে ইউরোর সেরা খেলোয়াড় ও ব্যালন ডি’অর জিতলেও সেই বছরের সেপ্টেম্বরে এসিএল লিগামেন্ট ছিঁড়ে তাঁর ক্যারিয়ার পড়েছিল অনিশ্চয়তায়। পরের দুটি মৌসুমও চোটে কাটিয়েছেন তিনি। তাই পুরস্কার হাতে তিনি নিজেও বলেছেন, তিনি সত্যিই এটি আশা করেননি।

বিতর্ক থামছে না কারণ মেসি পেয়েছেন সিলভার বল, আর ১০ গোল করে গোল্ডেন বুট জেতা এমবাপ্পে পেয়েছেন ব্রোঞ্জ। বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ স্পষ্ট। স্কাই স্পোর্টসের সাবেক স্ট্রাইকার জে বথরয়েড যুক্তি দিয়েছেন, মেসির 'এক্স-ফ্যাক্টর'-এর কাছে সব পরিসংখ্যান ম্লান, তাই গোল্ডেন বল তাঁরই জেতা উচিত ছিল। অন্যদিকে বলা হচ্ছে, মেসি অতিমানবীয় ছিলেন ফাইনালের আগপর্যন্ত, কিন্তু রদ্রি টুর্নামেন্টের প্রথম থেকে শেষ মিনিট পর্যন্ত প্রতিটি ম্যাচে একইভাবে পারফর্ম করেছেন। বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল আসলে একটি পুরোনো প্রশ্নেরই নতুন উত্তর দেয়—সেরা কি যে জাদু দেখায়, নাকি যে জেতায়? ২০২৬ সালে ফিফা বেছে নিয়েছে দ্বিতীয় উত্তরটি। তবে মেসির ভক্তদের সান্ত্বনা একটাই—গোল্ডেন বল হারালেও 'সর্বকালের সেরা'র মুকুট কেড়ে নেওয়ার সাধ্য কারও নেই, এবং সেটা স্বয়ং রদ্রিও স্বীকার করেছেন।