দেশের পাহাড়ি এলাকাগুলো বর্ষাকালে এক অনন্য রূপ ধারণ করে। মেঘে মোড়া চূড়া, গাঢ় সবুজ বনাঞ্চল আর উচ্ছ্বল ঝরনার ডাকে বহু পর্যটক ছুটে আসেন বান্দরবান, রাঙামাটি কিংবা খাগড়াছড়ির মতো স্থানে। কিন্তু পাহাড়ের এই অপার সৌন্দর্যের পাশাপাশি অনেকের মাঝে একধরনের মানসিক চাপ কাজ করতে পারে—যা উচ্চতাভীতি বা হাইট ফোবিয়া নামে পরিচিত। চিকিৎসাশাস্ত্রে একে বলা হয় অ্যাক্রোফোবিয়া, যেখানে কোনো উঁচু জায়গা দেখামাত্র বা সেখানে অবস্থানের সময় প্রবল ভীতি ও দুশ্চিন্তা সৃষ্টি হয়। এটি স্বাভাবিক সতর্কতার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। উঁচুতে দাঁড়িয়ে সাবধানতা অবলম্বন করা স্বাস্থ্যকর অভ্যাস, কিন্তু হাইট ফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি প্রায়শই নিরাপদ অবস্থানেও এক ধরনের অহেতুক আতঙ্কে ভোগেন। পাহাড়ের শিখর, খাড়া ঢালু পথ, দর্শনার্থী টাওয়ার, ঝুলন্ত সেতু বা এমনকি আকাশপথে ভ্রমণের সময়ও এই অনুভূতি প্রকট হতে পারে।

উচ্চতাভীতির প্রকাশ ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। কারও ক্ষেত্রে মাথা ঘোরা, বুক ধড়ফড়ানি, হাত-পা কাঁপুনি বা ঘাম হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। অনেকের ধারণা জন্মে, তারা ভারসাম্য হারাবেন অথবা নিচে পড়ে যাবেন। তীব্রতর অবস্থায় প্যানিক অ্যাটাক বা আতঙ্কজনিত আকস্মিক আক্রমণের ঘটনাও ঘটতে পারে। ফলে ভ্রমণের আনন্দ মুহূর্তের মধ্যেই উদ্বেগে রূপ নিতে পারে। তবে এটি জরুরি যে, পাহাড়ে পা রাখলেই হাইট ফোবিয়া হবে—এমন ধারণা ঠিক নয়। প্রথমবার পাহাড়ের উচ্চতায় সাময়িক ভীতি বা অস্বস্তি বোধ করা একটি সাধারণ প্রতিক্রিয়া। কিন্তু সেই ভয় যদি মাত্রাতিরিক্ত হয়ে দৈনন্দিন কার্যক্রম বা ভ্রমণকে বাধাগ্রস্ত করে, তাহলেই তাকে ফোবিয়া হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে।

যাদের উচ্চতাভীতি রয়েছে, তাদের জন্য কতগুলো পূর্বপ্রস্তুতি সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। সফরের আগে পাহাড়ি রুট ও গন্তব্যস্থল সম্পর্কে সম্যক ধারণা নেওয়া ভালো। অত্যধিক উঁচু কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ স্থান পরিহার করা, অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শকের সঙ্গে থাকা এবং দলগতভাবে চলাফেরা করলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে। খাড়া প্রান্তের একেবারে নিকটে না যাওয়া, ছবি তুলতে গিয়ে বিপদ না ডাকা এবং প্রয়োজনে কিছু সময় বসে বিশ্রাম নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গভীর ও ধীর শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণের অভ্যাসও উদ্বেগ প্রশমনে সাহায্য করে।

বর্ষাকালে পাহাড় ভ্রমণের সময় সতর্কতার গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পায়। বৃষ্টির ফলে পথ পিচ্ছিল হয়ে যায়, পিছলে পড়ার সম্ভাবনা বাড়ে। অনেক পাহাড়ি এলাকায় মুষলধারে বৃষ্টির পর ভূমিধসের আশঙ্কাও থাকে। তাই রওনা হওয়ার আগে আবহাওয়ার পূর্বাভাস জেনে নেওয়া, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সতর্কবার্তা মেনে চলা এবং বিপজ্জনক এলাকা এড়িয়ে যাওয়া উচিত। ভালো গ্রিপযুক্ত পাদুকা, রেইনকোট, প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম ও পর্যাপ্ত পানি সঙ্গে রাখলে ভ্রমণ অধিকতর নিরাপদ হয়। অনেক সময় উচ্চতার ভয় ও বাস্তব ঝুঁকি পরস্পরকে তীব্রতর করে তোলে। বর্ষার কুয়াশা, ভেজা পথ বা পিচ্ছিল ঢাল একজন ভীতু ব্যক্তির মনে আরও বেশি অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। সুতরাং নিজের মানসিক অবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি পরিবেশগত ঝুঁকিগুলো সম্পর্কেও সচেতন থাকা জরুরি।

পাহাড় প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক অতুলনীয় আকর্ষণ। কিন্তু সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও মানসিক স্বস্তির বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। হাইট ফোবিয়া সম্পর্কে সচেতনতা, যথাযথ প্রস্তুতি এবং বর্ষাকালের বিশেষ সতর্কতা অনুসরণ করলে পাহাড় ভ্রমণ একইসাথে রোমাঞ্চকর, নিরাপদ ও স্মরণীয় হয়ে উঠতে পারে।