রোববার রাজধানীর রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের (আইইবি) সম্মেলনকক্ষে ‘জুলাই শহীদ সাংবাদিক সম্মাননা’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল (এনইসি)। সেখানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত পাঁচ সাংবাদিকের পরিবারের হাতে সম্মাননা ও এক লাখ টাকা করে অর্থসহায়তা তুলে দেওয়া হয়। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

বক্তব্যে তিনি বলেন, গত ফ্যাসিবাদী শাসনের সময় গণমাধ্যমের দায়িত্ব ছিল ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা, কিন্তু তা না করে অনেক সাংবাদিক তোষামোদীতে লিপ্ত ছিলেন। তিনি বলেন, “তোষামোদী, মোসাহেবি—এই জিনিসটা আর দেখতে চাই না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ওটাই এখনো দেখতে হচ্ছে।” এই সংস্কৃতি কেবল গণমাধ্যমেই নয়, রাজনীতি ও আমলাতন্ত্রেও একই চিত্র দেখা যায় বলে মন্তব্য করেন তিনি। মির্জা ফখরুল মনে করেন, এই জাতিগত সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে বড় ধরনের বিপ্লবের প্রয়োজন হতে পারে, যা আমূল পরিবর্তন আনবে।

তিনি আরও বলেন, জুলাই সনদ অনুযায়ী বিএনপি যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়নে সরকার চেষ্টা করছে। তবে কিছু বিষয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চলছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, সনদে বলা আছে যে রাজনৈতিক দলগুলো একমত না হলে নির্বাচনে জয়ী দল নিজেদের ইশতেহার ও সমঝোতাকে প্রাধান্য দেবে, কিন্তু সেই বিষয়টি এখন উপেক্ষিত হচ্ছে। তিনি বিরোধী দলকে আহ্বান জানান, সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত কমিটির মাধ্যমে আলোচনায় সহায়তা করতে।

বিগত ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদের লুটপাট ও ধ্বংসযজ্ঞ একদিনে শুধরে নেওয়া সম্ভব নয় উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, “কিন্তু কাজটা শুরু করতে হবে। আমার বিশ্বাস, এই কাজটা আজ শুরু হয়েছে। হয়তো অনেক অপূর্ণতা রয়েছে, অসংগতি রয়েছে। কিন্তু কাজটা শুরু হয়েছে।”

অনুষ্ঠানের সভাপতি এনইসির সভাপতি ও ‘আমার দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, দেশে যাতে আবার ফ্যাসিবাদের উত্থান না ঘটে, সে জন্য জাতিকে সজাগ রাখতে এনইসি গঠিত হয়েছে। এই সংগঠনে ঢাকার বাইরের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সম্পাদকেরাও সমান গুরুত্ব পাবেন বলে তিনি জানান।

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গণি চৌধুরী বলেন, ফ্যাসিবাদ উৎখাতে সবচেয়ে বেশি অবদান জুলাই শহীদদের, কিন্তু দেশে তাদের নামে কোনো চত্বর নেই। শেখ হাসিনার পতন দিবসে শ্রদ্ধা জানানোর মতো জাতীয় স্থাপনাও নেই। তিনি জুলাই শহীদ চত্বর নির্মাণ এবং শহীদ সাংবাদিকদের হত্যার বিচার দাবি করেন।

ইংরেজি ‘দ্য ডেইলি ওয়াদার’ সম্পাদক শফিকুল আলম বলেন, জুলাই শেষ হয়নি, বরং যুগ যুগ ধরে তা চলবে। তিনি ঘোষণা দেন, এনইসি শহীদ সাংবাদিকদের সন্তানদের পড়াশোনার খরচ বহন করবে।

শহীদ সাংবাদিক তাহির জামান প্রিয়র মা সামসি আরা জামান বলেন, সাধারণ নাগরিক হিসেবে তিনি দেখেছেন, গণমাধ্যম যদি ফ্যাসিস্টের তাঁবেদারি না করত, তাহলে শেখ হাসিনা খুনি হওয়ার সাহস পেতেন না। তিনি জুলাই শহীদদের হত্যার বিচার ত্বরান্বিত এবং গণমাধ্যমকে নতুন ক্ষমতার তাঁবেদারি না করার আহ্বান জানান।

শহীদ সাংবাদিক হাসান মেহেদীর স্ত্রী ফারহানা ইসলাম পপি জানান, স্বামী হত্যার দুই বছর পার হলেও কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। তিনি দ্রুত বিচার দাবি করেন।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ‘যুগান্তর’-এর সম্পাদক আবদুল হাই শিকদার। স্বাগত বক্তব্য দেন ‘প্রতিদিনের বাংলাদেশ’ সম্পাদক মারুফ কামাল খান। আরও বক্তব্য রাখেন সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল বাছির, ‘নয়া দিগন্ত’ সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর, ‘নিউ নেশন’ সম্পাদক মোকাররম হোসেন ও সিলেটের ‘দৈনিক জালালাবাদ’-এর সম্পাদক মুকতাবিস-উন-নূর।