পুরান ঢাকার আলোচিত ভাঙারিব্যবসায়ী লাল চাঁদ হত্যাকাণ্ডের এক বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু মামলাটির বিচারপ্রক্রিয়া এখনো শুরু হয়নি। বরং পলাতক আসামিরা প্রকাশ্যে চলাফেরা করছে এবং নিহতের পরিবারকে হুমকি দিচ্ছে। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে পরিবারটি।

গত বছরের ৯ জুলাই স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (মিটফোর্ড) সামনের সড়কে লাল চাঁদকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। পিটিয়ে ও ইট-পাথরের খণ্ড দিয়ে আঘাত করে তাঁর মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ থেঁতলে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে তাকে বিবস্ত্র করে শরীরের ওপর লাফিয়ে উঠতে দেখা যায় সিসিটিভি ফুটেজে। এই হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং পুরান ঢাকার অপরাধচক্র নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।

হত্যার পরদিন নিহতের বড় বোন মঞ্জুয়ারা বেগম কোতোয়ালি থানায় ১৯ জনের নামে মামলা দায়ের করেন। প্রায় ছয় মাস তদন্ত শেষে গত বছরের ৮ ডিসেম্বর তৎকালীন ওসি মনিরুজ্জামান আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। তবে তাতে বানান ভুলসহ কিছু ত্রুটি ধরা পড়ায় সেগুলো সংশোধনের নির্দেশ দেন আদালত। ওসি মনিরুজ্জামান বদলি হয়ে গেলে মামলার দায়িত্ব নেন নতুন ওসি শাহ মো. ফয়সাল আহমেদ। পাঁচ মাস পর গত জুনে সংশোধিত অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ।

বর্তমানে মামলায় ২১ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ জন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। বাকি আটজন পলাতক। পলাতক আসামিরা হলেন—সারোয়ার, জহির, ইমরান, শারাফাত, জিয়াউদ্দিন, হোসেন চৌকিদার, মনির ও অপু। পরিবারের ভাষ্য, এই পলাতক আসামিরা তাদের হত্যার হুমকি দিচ্ছেন। বিশেষ করে সারোয়ার মেসেঞ্জারে হুমকি দিয়ে বলেছেন, ‘বাড়াবাড়ি করিস না। একটা হত্যা আর একাধিক হত্যার সাজা কিন্তু একই।’

লাল চাঁদের পরিবারের আরেক অভিযোগ, অভিযোগপত্রে আসামি ইমরানের বাবার নাম পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে। প্রথমে ইমরানের বাবার নাম আব্দুল আজিজ থাকলেও পরে তা নিজাম মাদবর দেখানো হয়েছে। পরিবারের ধারণা, টাকার বিনিময়ে পুলিশ এই নাম পরিবর্তন করেছে, যাতে ইমরানের জামিন পাওয়া সহজ হয়। ইমরান এখন পুরান ঢাকায় ‘ইমরান মেটাল’ নামে ভাঙারির দোকান চালাচ্ছে। তিনি লাল চাঁদের পরিবারের দোকান বন্ধের হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ।

পুলিশের দাবি, বাবার নাম পরিবর্তনের বিষয়টি তাদের অজানা। ওসি ফয়সাল আহমেদ জানিয়েছেন, এমন কিছু ঘটলে তা তাঁর অগোচরে হতে পারে। তবে পরে তিনি এ বিষয়ে কিছু জানাতে পারেননি।

মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী জিয়াউল হক জানান, সংশোধিত অভিযোগপত্র আদালত গ্রহণ করেছেন। মামলাটি এখন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে স্থানান্তরিত হয়েছে। নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে পরিবার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলাটি স্থানান্তরের দাবি জানিয়েছে, যা সরকার আগে আশ্বাস দিলেও বাস্তবায়িত হয়নি।

পলাতক আসামি শারাফাতের বিরুদ্ধে সম্প্রতি দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে এক ঝুট ব্যবসায়ীকে জোর করে তুলে নিয়ে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে মামলা হয়েছে। পুলিশের একজন অতিরিক্ত সুপার জানিয়েছেন, শারাফাত একজন দুর্ধর্ষ অপরাধী এবং তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

পরিবারের পক্ষে মামলা পরিচালনা করছেন বাদীর মেয়ে বিথি আক্তার। তিনি বলেন, ‘এক বছরেও বিচার শুরু হয়নি। বরং এখন আমরা হত্যার হুমকির মুখে জীবন নিয়ে শঙ্কায় আছি।’