বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণী চিন্তা ও নিয়মানুবর্তিতার যে মজবুত ভিত্তি তৈরি করে আসছে, তার ওপর এখন নতুন একটি স্তর যোগ করার সময় এসেছে বলে মনে করছেন একজন করপোরেট বিশেষজ্ঞ। নিজের ১৬ বছরের পেশাজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি দেখেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) আমাদের কাজের ধরন ও চাহিদা সম্পূর্ণ বদলে দিচ্ছে।

অতীতে গ্রাহকদের প্রয়োজন বুঝতে মাঠপর্যায়ে মাসের পর মাস গবেষণা করতে হতো। সঠিক প্রশ্ন তৈরি করা এবং পরিবর্তনের ধারা চিহ্নিত করা ছিল একটি কঠিন প্রক্রিয়া। কিন্তু বর্তমানে এআই মাধ্যমগুলো সেই একই তথ্য মিনিটের মধ্যে উপস্থাপন করছে। এর ফলে, পেশাদার জীবনে টিকে থাকার মূল দক্ষতা হয়ে উঠেছে সঠিক প্রশ্ন করার ক্ষমতা, যা একান্তই মানবীয় একটি গুণ। তার ভাষায়, “বিশ্ববিদ্যালয় মূলত তরুণদের মনে সেই জিজ্ঞাসার শক্তিটাই তৈরি করে।” কিন্তু এআই মাধ্যমের প্রায়োগিক ব্যবহারে শিক্ষার্থীদের ঘাটতি এখনো প্রকট। পাঠ্যক্রমে হাতে-কলমে কাজের সুযোগ বাড়ানো গেলে শিক্ষার্থীরা এই প্রযুক্তির গভীর বিষয়গুলো দ্রুত উপলব্ধি করতে পারবে।

তিনি প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও মানবিক গুণাবলির পার্থক্য বিশ্লেষণ করে জানান, দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি লক্ষ করেছেন, সেরা কোড লেখকেরা সবসময় প্রভাবশালী অবস্থানে ছিলেন না। বরং যারা জটিল ধারণাকে গল্পের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করতে, দলকে অনুপ্রাণিত করতে এবং দ্বন্দ্বের মীমাংসা করতে পেরেছেন, তারাই নেতৃত্বের স্থানে পৌঁছেছেন। টেলিযোগাযোগ খাতের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, নিছক প্রযুক্তিগত জ্ঞান একটি নির্দিষ্ট সীমানা পেরোতে বাধা দেয়। অপরদিকে, যারা প্রযুক্তির সঙ্গে আবেগপ্রবণ বুদ্ধিমত্তা ও গভীর চিন্তনের সমন্বয় ঘটাতে পেরেছেন, তারাই নেতৃত্বের আসন অর্জন করেছেন। এআই যদিও কোড লিখতে বা তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, কিন্তু একজন শোকার্ত গ্রাহকের বেদনা অনুধাবন করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কিংবা হতাশাগ্রস্ত একটি দলকে পুনরায় আত্মবিশ্বাসী করে তোলা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই কঠোর প্রায়োগিক দক্ষতা কেবল প্রবেশের পথ খুলে দেয়, কিন্তু মানবিক গুণাবলিই পেশাজীবনে দীর্ঘস্থায়ী করে।

এআই চাকরির সংকট সৃষ্টি করছে—এমন বাস্তবতা অস্বীকার না করে তিনি এর ভেতরে একটি বড় সুযোগ খুঁজে পান। আর্থিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে এখন সাধারণ রিপোর্ট বা প্রেজেন্টেশন তৈরির মতো কাজ এআই অনায়াসে সম্পন্ন করছে। আগে যা ছিল নবাগত তরুণদের দায়িত্ব। এই পরিবর্তনে প্রাথমিক স্তরের চাকরির সংজ্ঞা বদলে যাচ্ছে। তার মতে, এখন সেই কাজের অর্থ হওয়া উচিত এআই-এর সহায়তায় কার্য সম্পাদন এবং তাতে নিজের বিচারবুদ্ধির প্রয়োগ। যে তরুণ এআই ব্যবহার করে দশগুণ গতিতে কাজ শেষ করতে পারে এবং ফলাফলে নিজের প্রখর চিন্তা মিশিয়ে দিতে পারে, সে আর নিছক কনিষ্ঠ কর্মী থাকে না, বরং প্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন শক্তিতে পরিণত হয়।

নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়ে তিনি বলেন, এআইকে তিনি এখন একজন মেধাবী কিন্তু অনভিজ্ঞ শিক্ষানবিশ হিসেবে গণ্য করেন। প্রথম দিকে তার মনে হয়েছিল এটি সৃজনশীলতা কেড়ে নেবে, কিন্তু পরে বুঝেছেন এটি সৃজনশীলতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার মাধ্যমে একে দারুণভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তার পরামর্শ, এআইকে শুধু চ্যাট মাধ্যম হিসেবে না দেখে, বরং কখন কোন প্রশ্ন করতে হবে তা জানার ওপর গুরুত্ব দেওয়া।

জীবনব্যাপী শিক্ষার ধারণা নিয়ে তিনি বলেন, কোনো নির্দিষ্ট পাঠ্যক্রম সম্পন্ন করাই যথেষ্ট নয়। প্রতিদিন নতুন কিছু জানার আগ্রহকে জীবনের অঙ্গীভূত করতে হবে এবং স্বাচ্ছন্দ্যের পরিধিকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ করার অভ্যাস গড়তে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, নতুন দক্ষতা আয়ত্তের সময় আগের তুলনায় কমে এসেছে। আগে একটি কাজে দক্ষ হতে ১০ বছর লাগলেও এখন ৩ বছরই যথেষ্ট। নিজে করপোরেট, টেলিযোগাযোগ ও আর্থিক প্রযুক্তি—তিনটি ভিন্ন খাতে কাজ করে তিনি প্রতিবারই নতুন করে শিখেছেন এবং নিজের ভয়কে অগ্রগতির জ্বালানিতে রূপান্তর করেছেন। তার চূড়ান্ত উপলব্ধি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আগামী দিনে আসছে না, এটি ইতোমধ্যেই উপস্থিত। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয় হল, এর সঙ্গে সমন্বয় রেখে চলতে শেখা হবে, নাকি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার অগ্রযাত্রা দেখা হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়েই বাস্তব সমস্যা সমাধানে এআই ব্যবহারের অনুশীলন জরুরি বলে পরামর্শ দেন তিনি। ব্যক্তিগত প্রকল্প, স্বেচ্ছাসেবী কাজ কিংবা সৃজনশীল প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে এআইয়ের প্রয়োগ শেখার ওপর তিনি জোর দেন। এআইকে প্রতিপক্ষ না ভেবে সহযোগী হিসেবে দেখার মানসিকতা গড়ে তোলাই এখনকার সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি।