বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাম্প্রতিক কর্মসূচিকে 'হঠকারিতা' বলায় দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম পাল্টা জবাব দিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, সরকার তাদের বৈধ গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে ভুল ব্যাখ্যা করে আগে থেকেই একটি নেতিবাচক বয়ান তৈরি করছে, যার মাধ্যমে পরবর্তীকালে তাদের গ্রেপ্তার ও মামলার পথ প্রশস্ত করা হচ্ছে।
রাজধানীর গুলশানের হোটেল ওয়েস্টিনে সোমবার দুপুরে 'সাংবাদিকের চোখে জুলাই' শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। ডেমোক্রেটিক জার্নালিস্ট অ্যালায়েন্স (ডিজেএ) আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সত্য প্রকাশে অবদান রাখা একাধিক সাংবাদিক নিজেদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে তাদের গণতান্ত্রিক প্রতিবাদকে 'হঠকারিতা' হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, রাস্তায় বসে বিক্ষোভ তো একটি বৈধ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পদ্ধতি, এটি কীভাবে হঠকারিতা হতে পারে? তিনি আরও বলেন, আগামীকাল যখন তিনি প্ল্যাকার্ড হাতে রাস্তায় নামবেন, তখন সরকার হয়তো বলবে তিনি বাস ভাঙচুরের জন্য নেমেছেন এবং তাকে গ্রেপ্তার ও মামলা করা হবে। এই ন্যারেটিই সরকার তৈরি করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
প্রসঙ্গত, গত ১৪ আগস্ট জ্বালানি সংকটের প্রতিবাদে ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে সড়ক অবরোধ করে সমাবেশ করে এনসিপি। লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে নাহিদ ইসলামসহ দলের নেতারা হারিকেন প্রদর্শন করেন। সেই সমাবেশের কথা মনে করিয়ে দিয়ে শনিবার মহাখালীর টিঅ্যান্ডটি মাঠে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, পেছনে ফ্যানের বাতাস খেয়ে হাতে হারিকেন নিয়ে গ্যাস-বিদ্যুতের দাবি করা 'হঠকারিতা'। তিনি আরও বলেন, রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভাঙচুর করার রাজনীতির দিন শেষ।
প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যের জবাবে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিরোধী দল সংসদে এবং সংসদের বাইরেও কথা বলবে, এটাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চরিত্র। তিনি মনে করেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অহিংসভাবে নিজের কথা প্রকাশের সুযোগ থাকা উচিত। তাঁর কাছে মনে হচ্ছে, ধীরে ধীরে গণতন্ত্র সংকুচিত হয়ে আসছে। এই সংকোচন রোধে তিনি সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের নিরপেক্ষ ভূমিকা চান। তিনি বলেন, সাংবাদিকরা সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রচার করলেই যথেষ্ট, আর রাজনৈতিক দল হিসেবে তারা নিজেদের দায়িত্ব পালন করবেন।
এনসিপি আহ্বায়ক আরও বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে যে মুক্ত পরিবেশ রয়েছে তা 'আপৎকালীন'। এই পরিবেশ কতদিন থাকবে তা কেউ জানে না। তিনি বিএনপি সরকারের আমলে বহু সাংবাদিককে গণমাধ্যম থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ তোলেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে এনসিপি পর্যন্ত কিছু গণমাধ্যমের বিরূপ আচরণের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। দলের জ্যেষ্ঠ নেতা হাসনাত আবদুল্লাহর একটি বক্তব্যের পর একটি গণমাধ্যম ৪৮ ঘণ্টায় তাঁর সম্পর্কে ২০-৩০টি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বলে জানান নাহিদ। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এটা কোন ধরনের সাংবাদিকতা? ছাত্রনেতাদের চরিত্রহননের চেষ্টাও বিভিন্ন সাংবাদিক ও গণমাধ্যম থেকে করা হয়েছে বলেও তাঁর অভিযোগ।
জুলাই অভ্যুত্থানে সাংবাদিকদের ভূমিকার প্রশংসা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার সাংবাদিকরা পেশার ঊর্ধ্বে উঠে দেশপ্রেম, মানবিকতা ও বিবেকবোধের জায়গা থেকে কাজ করেছেন। সাংবাদিকদের সক্রিয়তা না থাকলে সেই আন্দোলন সফল হতো না বলেও তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে সাংবাদিকরা যে সাহসী ভূমিকা পালন করেছেন তার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। অভ্যুত্থানের পর তাদের সঙ্গে বসা উচিত ছিল, তা না করতে পারায় দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে সাংবাদিকদের সুরক্ষা আইনসহ ভালো নীতিগুলো বাস্তবায়নের দাবি জানান। জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত সাংবাদিকদের জন্য সরকারের উদ্যোগেরও দাবি তোলেন নাহিদ ইসলাম।




