আজ ৯ আগস্ট, বাংলা সংগীতজগতের কিংবদন্তি সুরকার আলাউদ্দীন আলীর ষষ্ঠ প্রয়াণবার্ষিকী। এই দিনে তাঁকে স্মরণ করে আবেগঘন একটি পোস্ট দিয়েছেন খ্যাতিমান সংগীতশিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ। রোববার সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে তিনি ক্যারিয়ারের প্রথম সিনেমার গানের রেকর্ডিংয়ের একটি স্মৃতি তুলে ধরেন, যেখানে আলাউদ্দীন আলীর ভূমিকা ছিল অনন্য।
১৯৮২ সালে 'ইন্সপেক্টর' সিনেমার মাধ্যমে জীবনের প্রথম সিনেমার গানে কণ্ঠ দেন কুমার বিশ্বজিৎ, যার সুর করেছিলেন আলাউদ্দীন আলী। শ্রুতি স্টুডিওতে মহরত অনুষ্ঠানে সংগীত অঙ্গনের অনেক বরেণ্য ব্যক্তিকে দেখে ভয় পেয়ে স্টুডিও থেকে বেরিয়ে যান তিনি। আলাউদ্দীন আলী পেছন পেছন গিয়ে কারণ জিজ্ঞেস করলে কুমার বিশ্বজিৎ জানান, তিনি আর গান গাইবেন না এবং চট্টগ্রামে ফিরে যাবেন। তখনই আলাউদ্দীন আলী তাঁর গালে একটি চড় বসিয়ে দেন এবং বলেন, 'যখন মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়াবে, তখন ভাববে তুমিই সেরা। আর যদি চিটাগাং চলে যাও, তাহলে তুমি শেষ।' কুমার বিশ্বজিৎ লিখেছেন, সংগীতের এই মহাজনের আশীর্বাদ পাওয়া যে কারও জন্যেই বড় প্রাপ্তি। সেই শাসন ও উৎসাহই তাঁকে ঢাকায় থেকে সংগীতচর্চা চালিয়ে যাওয়ার সাহস দিয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি। সন্তানতুল্য স্নেহ দানকারী আলাউদ্দীন আলী সেই চড় ও উৎসাহ না দিলে ঢাকায় থাকার সাহস পেতেন না বলেও জানান এই শিল্পী। জীবনের প্রতিটি ধাপে তাঁকে মিস করেন বলেও পোস্টে উল্লেখ করেন কুমার বিশ্বজিৎ।
উচ্চাঙ্গসংগীত ও লোকসংগীতের উপাদানের সঙ্গে আধুনিক আঙ্গিকের সূক্ষ্ম সংমিশ্রণে বাংলা চলচ্চিত্রের গানে নিজস্ব ঘরানা তৈরি করেছিলেন আলাউদ্দীন আলী। ১৯৫২ সালের ২৪ ডিসেম্বর মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার বাঁশবাড়ি গ্রামে তাঁর জন্ম। বাবা ওস্তাদ জাদব আলী এবং ছোট চাচা ওস্তাদ সাদেক আলীর কাছে তাঁর সংগীতে হাতেখড়ি। ছেলেবেলায় বেহালা বাজিয়ে অল পাকিস্তান চিলড্রেনস প্রতিযোগিতায় পুরস্কারও পেয়েছিলেন তিনি। কিশোর বয়সে ঢাকা অর্কেস্ট্রায় বেহালা বাজানোর সুবাদে সুবল দাস, আলী হোসেন, শহীদ আলতাফ মাহমুদ, খান আতাউর রহমান, খন্দকার নুরুল আলম, সত্য সাহা ও আনোয়ার পারভেজের মতো সংগীতজ্ঞদের সংস্পর্শে আসেন। আনোয়ার পারভেজের সহকারী হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি।
ষাটের দশকে বেহালাবাদক হিসেবে চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেন আলাউদ্দীন আলী। সংগীত পরিচালক হিসেবে তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র মীর মোহাম্মদ হালিম পরিচালিত 'সন্ধিক্ষণ'। ১৯৭৪ সালে ছবিটির কাজ করলেও এটি মুক্তি পায় ১৯৭৬ সালে। ব্যবসায়িক সাফল্য না পাওয়ায় শুরুতেই আলোচনায় আসতে পারেননি। তবে আমজাদ হোসেন পরিচালিত 'গোলাপী এখন ট্রেনে' ছবি তাঁর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ১৯৭৮ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবির 'আছেন আমার মোক্তার' ও 'হায় রে কপাল মন্দ, চোখ থাকিতে অন্ধ' গান দুটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। একই বছর 'ফকির মজনু শাহ' ছবির 'প্রেমের আগুনে', 'সবাই বলে বয়স বাড়ে' ও 'চোখের নজর এমনি কইরা' গানগুলোও শ্রোতাদের সাড়া ফেলে। প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, প্রথম ছবির সংগীত পরিচালনার পর দর্শকের সাড়া ভালো না পেলেও হতাশ হননি, বরং 'গোলাপী এখন ট্রেনে' ছবির মাধ্যমেই তিনি সাফল্যের ট্রেনে চড়ে বসেন।
পুরো সত্তরের দশক তাঁর সুরের মায়ায় আচ্ছন্ন ছিল বাংলা গানের শ্রোতারা। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্য নিয়মিত সুর করেছেন। 'ও আমার বাংলা মা তোর' ছিল টেলিভিশনের জন্য তাঁর সুর করা প্রথম গান। চলচ্চিত্র, বেতার ও টেলিভিশন মিলিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার গানের সুর সৃষ্টি করেছেন তিনি। তাঁর সুরে কনকচাঁপা, মাকসুদ, মিতালী মুখার্জি, কুমার বিশ্বজিৎ, সামিনা চৌধুরী, তপন চৌধুরী, আইয়ুব বাচ্চু ও হাসানের মতো শিল্পীদের চলচ্চিত্রের গানে যাত্রা শুরু হয়। তাঁর প্রয়াত স্ত্রী সালমা সুলতানা ছিলেন নজরুলসংগীতশিল্পী এবং দ্বিতীয় স্ত্রী মিমি আলাউদ্দীনও আধুনিক গানের শিল্পী।
গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার বলেছিলেন, আলাউদ্দীন আলীর এত ভালো গানের নাম বলতে গেলে অনেক সময় লেগে যাবে এবং বাংলা চলচ্চিত্রের গান বলতেই এক সময় তিনি। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার তিনি পেয়েছেন সংগীত পরিচালক ও গীতিকার হিসেবে একাধিকবার। সৈয়দ আব্দুল হাদীর মতে, আলাউদ্দীন আলী সুরের রং দিয়ে অন্তরের বিমূর্ত ভাবনাকে মূর্ত করে তুলতে পারতেন। 'ও আমার বাংলা মা তোর আকুল করা রূপের সুধায়' বা 'সূর্যোদয়ে তুমি সূর্যাস্তেও তুমি' গানে স্বদেশ ও প্রকৃতির প্রতি বিমুগ্ধতা আর 'আমায় গেঁথে দাও না মাগো' গানে স্বজন হারানোর বেদনাবোধ যেন সুরের রংতুলিতে আঁকা ছবি। সাবিনা ইয়াসমীন তাঁকে ভারতীয় উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালকদের একজন মনে করতেন এবং বলেছিলেন, তাঁরা যুগে যুগে আসেন না।
'এই দুনিয়া এখন তো আর সেই দুনিয়া নাই', 'আছেন আমার মোক্তার, আছেন আমার ব্যারিস্টার', 'আমায় গেঁথে দাও না মাগো একটা পলাশ ফুলের মালা', 'শত জনমের স্বপ্ন তুমি আমার জীবনে এলে', 'কী করে বলিব আমি আমার মনে বড় জ্বালা', 'ভালোবাসা যত বড় জীবন তত বড় নয়', 'চোখের নজর এমনি কইরা', 'যেটুকু সময় তুমি থাকো কাছে', 'যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়', 'একবার যদি কেউ ভালোবাসত', 'সূর্যোদয়ে তুমি সূর্যাস্তেও তুমি', 'বন্ধু তিন দিন তোর বাড়িত গেলাম', 'জন্ম থেকে জ্বলছি মাগো', 'সুখে থাকো ও আমার নন্দিনী' ও 'একা একা কেন ভালো লাগে না'—তাঁর সুর করা বহু গান এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
দীর্ঘদিন ফুসফুসের প্রদাহ ও রক্তে সংক্রমণসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন আলাউদ্দীন আলী। ২০১৫ সালে ব্যাংককে চিকিৎসার সময় তাঁর ফুসফুসে টিউমার ধরা পড়ে এবং পরে ক্যানসারের চিকিৎসাও চলেছিল। ২০২০ সালের ৮ আগস্ট শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে রাজধানীর একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাঁকে। সেখানে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। পরদিন ৯ আগস্ট শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি সুরকার। আজ তাঁর চলে যাওয়ার ছয় বছর পূর্ণ হলো। কুমার বিশ্বজিতের মতো তাঁর সান্নিধ্য পাওয়া অনেক শিল্পীই এ দিনে স্মৃতিচারণ করেছেন—কেউ মনে করছেন তাঁর স্নেহ ও শাসনের কথা, কেউবা ফিরে যাচ্ছেন সুর তৈরির দিনগুলোয়। শ্রোতাদের কাছে তিনি চিরকাল ফিরে আসবেন তাঁর অমর সব গানের মায়াজালে।




