দক্ষিণ ভারতের জনপ্রিয় অভিনেতা মহেশ বাবু আজ তাঁর জন্মদিনে ভক্তদের কাছ থেকে ভালোবাসা পাচ্ছেন। ১৯৭৫ সালের ৯ আগস্ট চেন্নাইয়ে জন্মগ্রহণ করেন তিনি, যদিও তাঁর পারিবারিক শিকড় পশ্চিম তেলেঙ্গানা ও অন্ধ্রপ্রদেশে। অভিনয় যেন তাঁর রক্তেই ছিল — বাবা ঘট্টামানেনি কৃষ্ণা ছিলেন তেলেগু সিনেমার কিংবদন্তি, যিনি ৩৫০টির বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন। বড় ভাই রমেশ বাবুও ছিলেন অভিনেতা এবং পরে প্রযোজক হিসেবে কাজ করেছেন। মজার ব্যাপার হলো, তাঁর স্কুলজীবনের বন্ধুদের মধ্যে রয়েছেন তামিল সিনেমার অন্যতম তারকা বিজয় এবং বিখ্যাত কার্তিক শিবকুমার।
চার বছর বয়সেই ক্যামেরার সামনে প্রথম দাঁড়ান তিনি। বাবার প্রযোজিত ১৯৭৯ সালের 'নিদ' ছবিতে ছোট্ট একটি চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু। এরপর শিশুশিল্পী হিসেবে আরও আটটি ছবিতে কাজ করেন তিনি। এমনকি সে সময় থেকেই সংলাপ মুখস্থ করার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। প্রাপ্তবয়স্ক অভিনেতা হিসেবে প্রায় দুই দশকের ক্যারিয়ারে মহেশ বাবু ৬০টির বেশি সিনেমায় অভিনয় করেছেন। 'মুরারি', 'অথাডু', 'পোকিরি', 'বিজু', 'ডোকাডু', 'মহর্ষি', 'সারিলেরু নিকেভভারু' — তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের তালিকাটা দীর্ঘ। বিশেষ করে ২০০৬ সালে মুক্তি পাওয়া 'পোকিরি' ছবিটি পরে সালমান খানের 'ওয়ান্টেড' হিসেবে হিন্দিতে রিমেক হয়। তবে নিজে কখনো কোনো রিমেক ছবিতে কাজ করেননি — এটি তাঁর ব্যতিক্রমী রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত হয়।
পুরস্কারের পাল্লাতেও কম যাননি তিনি। ৯টি নন্দী অ্যাওয়ার্ড (তেলেগু সিনেমার সর্বোচ্চ সম্মান), ৫টি ফিল্মফেয়ার সাউথ অ্যাওয়ার্ড, ৩টি সাউথ ইন্ডিয়ান ইন্টারন্যাশনাল মুভি অ্যাওয়ার্ড এবং একটি আইফা পুরস্কারসহ অসংখ্য স্বীকৃতি জিতেছেন। ভক্তদের কাছে তিনি 'প্রিন্স' নামে পরিচিত; কেউ কেউ তাঁকে 'তেলেগু ছবির রাজপুত্র'ও বলেন। ২০১০ সালে টাইমস অব ইন্ডিয়ার '৫০ মোস্ট ডিজায়ারেবল মেন অব ইন্ডিয়া' তালিকায় তাঁর অবস্থান ছিল ১২ নম্বরে। পরের বছর সেই তালিকায় তিনি পেছনে ফেলেছিলেন হৃতিক রোশন, সালমান খান ও শাহরুখ খানের মতো বলিউডের শীর্ষ তারকাদের। ২০১৯ সালে তিনি প্রথম তেলেগু অভিনেতা হিসেবে মাদাম তুসো মিউজিয়ামে নিজের মোমের মূর্তি স্থাপন করেন।
বিস্ময়কর হলেও সত্য, মাতৃভাষা তেলেগু হলেও মহেশ বাবু এই ভাষায় পড়তে বা লিখতে পারেন না। চেন্নাইয়ে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ার কারণে তাঁর দক্ষতা গড়ে ওঠে তামিল ও ইংরেজিতে। তবে এই সীমাবদ্ধতাও তাঁকে থামাতে পারেনি — তিনি শুনে শুনেই সংলাপ মুখস্থ করেন এবং পর্দায় সাবলীলভাবে বলেন, যেখানে তাঁর উচ্চারণে কোনো ত্রুটি ধরা পড়ে না। তাঁর ১৮টির বেশি ছবি হিন্দিতে ডাব হয়েছে এবং হিন্দি চ্যানেলে প্রচারিত হলে টিআরপি থাকে শীর্ষে। অনেক সময় টিভি ভিউয়ারশিপ মূল হিন্দি ছবিকেও ছাড়িয়ে যায়।
পর্দার বাইরেও তিনি সমানভাবে দায়িত্বশীল ও বিনয়ী। শিশুস্বাস্থ্য, ক্যানসার চিকিৎসা, গ্রামীণ শিক্ষা ও নারী অধিকার — বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজে তাঁর অবদান রয়েছে। ব্যক্তিগত তহবিল থেকে তেলেঙ্গানার দুটি স্কুল ও অন্ধ্রপ্রদেশের দুটি হাসপাতালে বিশাল অঙ্কের অনুদান দিয়েছেন। তাঁর স্ত্রী নম্রতা শিরোদকারও সমাজসেবায় সক্রিয় এবং তাঁরা মিলে গড়েছেন 'হিল স্পিরিট ফাউন্ডেশন'।
ব্যবসার দিক থেকেও পিছিয়ে নেই তিনি। ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন 'জি মহেশ বাবু এন্টারটেইনমেন্ট'। এই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে 'শ্রীমন্তুডু', 'মেজর', 'সারিলেরু নেক্কেভারু'র মতো ছবি নির্মিত হয়েছে। ২০১৮ সালে এশিয়ান সিনেমাসের সঙ্গে অংশীদারত্বে হায়দরাবাদে চালু করেন 'এএমবি সিনেমাস' নামের একটি প্রিমিয়াম মাল্টিপ্লেক্স। ভবিষ্যতে 'এএমবি ক্লাসিক' নামে নতুন মাল্টিপ্লেক্স চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। সম্পদের সরকারি হিসাব প্রকাশ না হলেও বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশি টাকায় তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ৪০০ কোটি টাকার বেশি। তাঁর আয়ের প্রধান উৎস সিনেমার পারিশ্রমিক এবং ব্র্যান্ড এনডোর্সমেন্ট।
তবে বিতর্কও তাঁকে ছুঁয়ে গেছে। সম্প্রতি তেলেঙ্গানার একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানির বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে, যেখানে তিনি শুভেচ্ছাদূত ছিলেন। অভিযোগ ছিল, তাঁর জনপ্রিয়তার কারণে অনেকেই সেখানে বিনিয়োগ করে ক্ষতির মুখে পড়েছেন। যদিও এখন পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে সরাসরি জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ মেলেনি। ভারতের এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকেছিল এবং তিনি আইনি প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করেছেন বলে জানানো হয়েছে।
এখন তিনি আলোচনায় এসেছেন ভারতের সবচেয়ে ব্যয়বহুল সিনেমা 'বারানসি'র কারণে। 'বাহুবলী'খ্যাত পরিচালক এস এস রাজামৌলির এই ছবিতে মহেশ বাবু রুদ্র নামের এক চরিত্রে অভিনয় করছেন, যেখানে তাঁর সহশিল্পী প্রিয়াঙ্কা চোপড়া জোনাস ও পৃথ্বীরাজ সুকুমারন। ছবির গল্প সাধারণ ভারতীয় সিনেমার তুলনায় অনেক বড় পরিসরের — ভারতের পাশাপাশি অ্যান্টার্কটিকা, আফ্রিকা ও প্রাচীন রোমের মতো বিভিন্ন সময় ও স্থানের প্রেক্ষাপটে গল্প এগোবে। পরিচালক জানিয়েছেন, ছবিটির বড় অংশ আইম্যাক্স ফরম্যাটে ধারণ করা হচ্ছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, রুদ্রকে পৃথিবীর জন্য ভয়াবহ এক গ্রহাণু-হুমকির মুখোমুখি হতে দেখা যাবে। প্রিয়াঙ্কা চোপড়া গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র মান্দাকিনীর ভূমিকায় এবং পৃথ্বীরাজ প্রযুক্তিবিদ ভিলেন কুম্ভ চরিত্রে অভিনয় করছেন। জন্মদিন উপলক্ষে প্রকাশিত স্থিরচিত্রে মহেশ বাবুর চরিত্রটিকে রাজামৌলি বুদ্ধিদীপ্ত, সংবেদনশীল ও দুর্ধর্ষ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ছবিটির শুটিং এখনো চলছে; জুলাইয়ে বড় অ্যাকশন অংশের কাজ শেষ হলেও আরও প্রায় ৮০ দিনের শুটিং বাকি ছিল। ২০২৭ সালের ৭ এপ্রিল প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ইন্ডিয়া টুডে ও ডেকান ক্রনিকল অবলম্বনে




