১৯৩৭ সাল, হলিউডের স্বর্ণযুগ হিসেবে পরিচিত। সেই সময়ের ঝলমলে পর্দার আড়ালে ঘটে গিয়েছিল এক নারীর জীবনের সবচেয়ে বড় অন্ধকার অধ্যায়। নৃত্যশিল্পী ও এক্সট্রা অভিনেত্রী প্যাট্রিসিয়া ডগলাসের ওপর যৌন নির্যাতনের ঘটনা আজও হলিউডের ইতিহাসের কলঙ্কজনক একটি অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। সেই সময়ে যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে কণ্ঠ তোলা ছিল প্রায় অকল্পনীয় সাহসের কাজ, যা করেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই সাহসই যে তার জীবনের পতন ডেকে আনবে, তা বোধহয় তিনি নিজেও জানতেন না।

বিখ্যাত স্টুডিও মেট্রো-গোল্ডউইন-মেয়ার (এমজিএম) ১৯৩৭ সালে একটি করপোরেট পার্টির আয়োজন করে। অতিথিদের বিনোদনের জন্য ডগলাসসহ বেশ কয়েকজন নারীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, যাদের কাজ ছিল অতিথিদের জন্য নাচ করা। পার্টিতেই ঘটে যায় অঘটন। ডগলাসের অভিযোগ, তাঁকে জোর করে মদ পান করানো হয়। অসুস্থ বোধ করায় তিনি বাইরে বেরিয়ে গেলে এমজিএম-এর বিক্রয় বিভাগের কর্মী ডেভিড রজ তাঁকে একটি গাড়িতে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করেন।

ঘটনার পরপরই প্যাট্রিসিয়া হাসপাতালে যান এবং পুলিশে অভিযোগ দায়ের করেন। আইনি খরচও তিনি নিজেই বহন করেছিলেন। কিন্তু অভিযোগের পরপরই শুরু হয় পাল্টা আক্রমণ। ডগলাসের দাবি, হাসপাতালে তাঁর শরীর পরিষ্কার করে দেওয়া হয়, ফলে ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ ফরেনসিক প্রমাণ নষ্ট হয়ে যায়। সংবাদমাধ্যমও তার বিরুদ্ধে বিষোদগার শুরু করে। তাঁকে উচ্ছৃঙ্খল, চরিত্রহীন হিসেবে তুলে ধরা হয় এবং এমনকি তাঁর যৌনরোগ রয়েছে বলেও গুজব ছড়ানো হয়। সে সময় অভিযোগ উঠেছিল, মামলার অভিযোগ প্রত্যাহারের বিনিময়ে প্রসিকিউটর ঘুষ নিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত মামলাটি আর এগোয়নি।

এই ঘটনার পর কার্যত হলিউডে আর কাজ পাননি ডগলাস। গবেষকদের মতে, তাঁকে অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘ব্ল্যাক লিস্ট’-এ রাখা হয়েছিল, যা তাঁর অভিনয়জীবনের সমাপ্তি ঘটায়। ক্ষমতাবান প্রতিষ্ঠানের কাছে হেরে গিয়ে দীর্ঘ সময় তিনি নীরব ছিলেন এবং হলিউড থেকে দূরে সরে যান। কয়েক দশক পর পরিচালক ও লেখক ডেভিড স্টেন তাঁকে খুঁজে বের করেন। প্রথমে ঘটনা নিয়ে মুখ খুলতে চাননি তিনি, কারণ ততদিনে তাঁর বয়স হয়েছিল এবং তিনি অসুস্থ ছিলেন। তবে তিনি জানিয়েছিলেন, মৃত্যুর আগে তিনি পুরো ঘটনার বর্ণনা দেবেন। সেই সাক্ষাৎকারটি ভ্যানিটি ফেয়ারে প্রকাশিত হয়।

২০০৩ সালে প্যাট্রিসিয়া ডগলাস মারা যান। তার মৃত্যুর পর ধারণ করা সাক্ষাৎকারটি ২০০৭ সালে ‘গার্ল ২৭’ নামে একটি তথ্যচিত্র আকারে প্রকাশিত হয়। হলিউডে ২৭ নম্বর তালিকাভুক্ত এক্সট্রা অভিনেত্রী ছিলেন তিনি বলেই তথ্যচিত্রটির এমন নামকরণ। ট্যাগ লাইন ছিল, ‘৭০ বছর, টাকা এবং ক্ষমতা সত্যকে চাপা দিয়ে রেখেছিল।’ তথ্যচিত্রটি শুধু ডগলাসের ঘটনাই নয়, হলিউডের শুরুর যুগে নারীদের প্রতি যৌন নির্যাতনের সংস্কৃতিও তুলে ধরে। সানড্যান্স চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসা পাওয়া তথ্যচিত্রটি দেখে অভিনেত্রী রোজ ম্যাকগাওয়ান ও জেসিকা চ্যাস্টেইন এর প্রশংসা করেন। ম্যাকগাওয়ান আরও অভিযোগ করেন, যে খামারবাড়িতে পার্টিটি হয়েছিল, সেখানে আরও নারীরা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন।

ডগলাসের মামলা আদালতে বিচার পায়নি, তবে তার ঘটনা ইতিহাসে এমন এক প্রতীকে পরিণত হয়েছে, যেখানে একজন নারী অভিযোগ করার পরও বিচারের বদলে তাঁকেই অপরাধী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। ক্ষমতার অপব্যবহার, ভুক্তভোগীকে দোষারোপ এবং প্রাতিষ্ঠানিক চাপের এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে আজও এই ঘটনাকে উল্লেখ করেন গবেষক ও চলচ্চিত্র-ইতিহাসবিদরা। এক ঘণ্টা ২৬ মিনিটের এই তথ্যচিত্রে প্যাট্রিসিয়ার জন্ম ১৯১৭ সালে এবং ঘটনার সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২০ বছর।