একটি নবজাতক ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর শালদুধ পান করানো, শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং নিয়মিত টিকাগুলো প্রদানের প্রাথমিক ধাপগুলো সম্পর্কে আমাদের সবারই কমবেশি ধারণা রয়েছে। কিন্তু এই সাধারণ জ্ঞানের বাইরেও কিছু জরুরি চিকিৎসা পদ্ধতি ও পরীক্ষা রয়েছে, যেগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকা আবশ্যক। যেমন, প্রসবের ঠিক পরেই কোন কোন মেডিকেল টেস্ট করা হয়, কখন করতে হয় এবং কোনো বিশেষ টিকা দেওয়ার প্রয়োজন আছে কি না।
স্ক্রিনিং পরীক্ষার ক্ষেত্রে, জন্মের পরপরই নবজাতকের গোড়ালি থেকে রক্ত নিয়ে সুগার পরীক্ষা করা একটি সাধারণ রীতি। বিশেষত, যদি মায়ের গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস ধরা পড়ে, তাহলে এই পরীক্ষাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ মায়ের ডায়াবেটিস থাকলে সদ্যোজাত শিশুর রক্তে শর্করার মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ার অর্থাৎ হাইপোগ্লাইসেমিয়ার আশঙ্কা থাকে। এছাড়াও, আরও কিছু পরীক্ষা রয়েছে যেগুলো করা হয়ে থাকে। থাইরয়েড হরমোন পরীক্ষা সাধারণত জন্মের সাত দিন পর করা হয়, মায়ের যদি থাইরয়েডজনিত কোনো সমস্যা থেকে থাকে তবে এটি বিশেষভাবে জরুরি। প্রয়োজন অনুসারে গ্যালাকটোসেমিয়া, সিকেল সেল অ্যানিমিয়া, ফেনাইলকিটোনিউরিয়া, হোমোসিস্টিনিউরিয়া, অ্যাড্রেনোজেনিটাল সিনড্রোম, সিস্টিক ফাইব্রোসিস এবং স্থানীয় স্বাস্থ্য নীতিমালা দ্বারা নির্ধারিত অন্যান্য স্ক্রিনিং পরীক্ষাও করানোর প্রয়োজন হতে পারে। নবজাতকের শরীরে জন্ডিস দেখা দিলে বিলিরুবিন পরীক্ষা করানো উচিত।
জন্মের প্রথম ২৪ ঘণ্টার ভেতরেই মায়ের সম্পূর্ণ মেডিকেল রেকর্ড পর্যালোচনা করে শিশুর একটি পূর্ণাঙ্গ শারীরিক পরীক্ষা সম্পন্ন করা দরকার। যদি কোনো জন্মগত ত্রুটি বা সমস্যার সন্দেহ তৈরি হয়, তাহলে চিকিৎসক প্রয়োজনে আলট্রাসনোগ্রাম, এক্স-রে, ইকোকার্ডিওগ্রাফি বা বিশেষ রক্ত পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন।
টিকাদানের বিষয়ে, অন্যান্য নিয়মিত টিকার পাশাপাশি প্রতিটি নবজাতককে হেপাটাইটিস বি-এর টিকা প্রদান করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু যদি মা নিজে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের বাহক হয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে শুধু টিকা নয়, শিশুকে হেপাটাইটিস বি ইমিউনোগ্লোবুলিনও দিতে হবে। অপরদিকে, অনেকেই জন্মের পর শিশুর খতনা করিয়ে থাকেন। তবে এখানে একটি সতর্কতা জরুরি, শিশুর যদি হাইপোস্পাডিয়াস, অস্পষ্ট যৌনাঙ্গ অথবা রক্তক্ষরণজনিত কোনো রোগ থাকে, তাহলে এই খতনার প্রক্রিয়াটি সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে হবে।
নবজাতকের স্বাভাবিক মানসিক ও শারীরিক বিকাশের একটি বড় অংশ নির্ভর করে মা এবং শিশুর পারস্পরিক স্নেহপূর্ণ বন্ধনের ওপর, যা তাদের মানসিক ও শারীরবৃত্তীয়ভাবে এক সুতোয় গেঁথে রাখে। জন্মের প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যেই প্রসবকক্ষে মায়ের সঙ্গে শিশুর প্রাথমিক সংস্পর্শ স্থাপন করে দেওয়া উচিত। এক্ষেত্রে ত্বক থেকে ত্বকের স্পর্শ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর শিশুর যে প্রাথমিক শান্ত ও সজাগ অবস্থা বিরাজ করে, তা মা ও শিশুর চোখে চোখে যোগাযোগের এক অনন্য সুযোগ তৈরি করে দেয়, যা সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসার অনুভূতি জাগ্রত করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। শিশুর কান্না মায়ের মধ্যে তৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, যেমন শিশুকে আলতো করে ছোঁয়া এবং শান্ত স্বরে কথা বলা। শিশুর গালে কেউ স্পর্শ করলে তার মধ্যে ‘রুটিং রিফ্লেক্স’-এর প্রকাশ ঘটে, যা মাকে স্তন্যপান করাতে উদ্বুদ্ধ করে। স্তন্য চোষা বা চাটার প্রক্রিয়া মায়ের শরীরে প্রোল্যাকটিন হরমোন নিঃসরণ করে, যা পর্যাপ্ত বুকের দুধ উৎপাদনের জন্য অপরিহার্য। এমনকি অসুস্থ নবজাতকের ক্ষেত্রেও, মায়েদের যতটা সম্ভব সন্তানের পরিচর্যায় সম্পৃক্ত হতে উৎসাহিত করতে হবে।




