ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই শুধু গোল, জয়-পরাজয় নয়; এটি ইতিহাস সৃষ্টিরও এক অনন্য মঞ্চ। অনেক সময় দেখা যায়, বাবার পথ ধরেই বিশ্বকাপের মাঠে পা রাখেন সন্তানেরা। কেউ বাবার সমান উচ্চতায় পৌঁছান, আবার কেউ ছাড়িয়ে যান তাঁকেও। ফুটবলের ইতিহাসে এমন অসংখ্য পিতা-পুত্র জুটির দেখা মেলে, যাঁরা বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের নাম খোদাই করে গেছেন।

সর্বাধিক পরিচিত ও সফল জুটি বলা হয় ইতালির মালদিনি পরিবারকে। বাবা সিজার মালদিনি ১৯৬২ বিশ্বকাপে ইতালির রক্ষণে ছিলেন অপরিহার্য। তাঁর দেখাদেখি ছেলে পাওলো মালদিনি শুধু ইতালির নয়, বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। চারটি বিশ্বকাপে (১৯৯০, ১৯৯৪, ১৯৯৮, ২০০২) অংশ নেওয়া পাওলো বাবার রেকর্ডও ভেঙে দেন। মজার ব্যাপার হলো, পাওলোর ছেলে দানিয়েল মালদিনিও ইতালির জার্সি গায়ে দিয়েছেন, কিন্তু ইতালি বিশ্বকাপে সুযোগ না পাওয়ায় তিন প্রজন্মের বিশ্বকাপ খেলার সম্ভাবনা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি।

গোলপোস্টের নিচে বাজপাখির মতো প্রতিক্রিয়া দেখানোর ক্ষেত্রে ডেনমার্কের পিটার ও ক্যাসপার স্মাইকেলের জুটি অতুলনীয়। পিটার ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ডেনমার্কের জাল রক্ষা করেছিলেন এবং ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে বিশ্বজয় করেছিলেন। তাঁর পথ ধরেই ক্যাসপার ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপে ডেনমার্কের গোলপোস্টে দাঁড়ান, এবং নিজের পারফরম্যান্সে সবার নজর কাড়েন। তবে বর্তমান বিশ্বকাপে ডেনমার্কের অংশগ্রহণ না থাকায় তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিয়েছেন।

নেদারল্যান্ডসের ড্যানি ও ডেলি ব্লিন্ডের কাহিনি আরও চমকপ্রদ। ২০১৪ বিশ্বকাপে বাবা ড্যানি যখন নেদারল্যান্ডসের সহকারী কোচ, তখন ছেলে ডেলি মাঠের খেলোয়াড় হিসেবে খেলছিলেন। বাবা ১৯৯০ ও ১৯৯৪ বিশ্বকাপে খেললেও ডেলি ২০১৪ ও ২০২২ আসরে একই পজিশনে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেছেন।

ফ্রান্সের বিখ্যাত ডিফেন্ডার লিলিয়ান থুরাম ছিলেন দলের স্বর্ণযুগের অংশ। ১৯৯৮ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত তিনটি বিশ্বকাপে তিনি ফ্রান্সের রক্ষণ সামলেছেন। তাঁর পথ ধরে ১৬ বছর পর ২০২২ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের জার্সি গায়ে দেন মার্কাস থুরাম। মজার বিষয়, বাবা রানার্সআপ হয়েই বিশ্বকাপ শেষ করেছিলেন, আর ছেলেও শুরু করলেন রানার্সআপ হয়েই।

২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে এসেছে নরওয়ে, আর তার নায়ক আর্লিং হলান্ড। তাঁর বাবা আলফি হলান্ড ১৯৯৪ বিশ্বকাপে নরওয়ের হয়ে খেলেছিলেন। আলফি ম্যানচেস্টার সিটির সাবেক মিডফিল্ডার। এখন ছেলে আর্লিং নিজের গোলের ঝড়ে বিশ্বকাপ মাতিয়ে চলেছেন।

সবচেয়ে চমকপ্রদ গল্পটি ব্রাজিলের মিডফিল্ডার মাজিনহোর। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের জার্সিতে খেলা মাজিনহোর ছেলে থিয়াগো আলকানতারা ব্রাজিলের হয়ে না খেলে স্পেনের জার্সি গায়ে দেন। তিনি ২০১৮ বিশ্বকাপে স্পেনের হয়ে মাঠ কাঁপিয়েছেন। তাঁর ভাই রাফিনহা আলকানতারাও ফুটবলার, যদিও বিশ্বকাপে না খেললেও অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জিতেছেন।

ফ্রান্সের জিনেদিন জিদান ১৯৯৮ বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক এবং ২০০৬ বিশ্বকাপে দেওয়া ঢুসের জন্য সমান বিখ্যাত। তাঁর ছেলে লুকা জিদান ফ্রান্সের যুব দলে খেললেও মূল দলে সুযোগ পাননি। তাই তিনি নাগরিকত্ব বদলে আলজেরিয়ায় যোগ দেন এবং বর্তমান বিশ্বকাপে আলজেরিয়ার হয়ে খেলছেন।

এবার আসা যাক এক অনন্য জুটির কথা। নিউজিল্যান্ডের জেনি বিন্ডন ও টাইলার বিন্ডন পিতা-পুত্র নন, বরং মা-ছেলে। জেনি ২০০৭ ও ২০১১ বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের গোলরক্ষক ছিলেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে অভিষেক হয়েছে তাঁর ছেলে টাইলারের। বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম মা-ছেলে জুটি হিসেবে তাঁরা রেকর্ড গড়েছেন।

এভাবেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বিশ্বকাপের মঞ্চে পিতার পথ ধরে সন্তানেরা নিজেদের আলাদা পরিচয় তৈরি করে চলেছেন। প্রতিটি জুটির গল্পই ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা এবং পারিবারিক ঐতিহ্যের এক অনন্য উদাহরণ।