পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্য হয়েও বঞ্চিতদের তালিকায় অগ্রগণ্য নাম চিয়েন-শিউং উ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ম্যানহাটান প্রজেক্টে তাঁর অসামান্য দক্ষতা প্রকাশ পায়। হ্যানফোর্ড রিঅ্যাক্টরে বারবার চেইন রিঅ্যাকশন বন্ধ হওয়ার সমস্যা সমাধানে এনরিকো ফার্মি তাঁর সাহায্য চান। মাত্র ৩০ বছর বয়সে তিনি শনাক্ত করেন জেনন-১৩৫ আইসোটোপ নিউট্রন শোষণের মাধ্যমে পারমাণবিক বিক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। ফার্মির অনুরোধে ওপেনহেইমার তাঁকে প্রকল্পে সিনিয়র বিজ্ঞানী হিসেবে নিয়োগ দেন। তিনি গ্যাস ডিফিউশন প্রক্রিয়া ও নিউট্রন মিথস্ক্রিয়া পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করেন এবং উন্নত গাইগার কাউন্টার তৈরিতেও অবদান রাখেন।
যুদ্ধ শেষে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা চালিয়ে যান। ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি লি ও ইয়াং প্যারিটি সূত্র নিয়ে প্রশ্ন তুললে তাদের তাত্ত্বিক প্রস্তাব পরীক্ষামূলকভাবে প্রমাণের দায়িত্ব নেন উ। তরল গ্যাস ব্যবহার করে অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় কোবাল্ট-৬০-এর বিটা ক্ষয় পর্যবেক্ষণ করে তিনি দেখান যে দুর্বল নিউক্লিয়ার বলের ক্ষেত্রে প্যারিটি সংরক্ষিত হয় না। এই যুগান্তকারী আবিষ্কার সত্ত্বেও ১৯৫৭ সালে নোবেল পুরস্কার পান কেবল তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী লি ও ইয়াং। উ-এর অবদানকে সম্মান জানাতে ১৯৭৮ সালে চালু হওয়া উল্ফ পুরস্কারের প্রথম প্রাপক হন তিনি।
চীনের লিউহি গ্রামে ১৯১২ সালে জন্ম নেওয়া উ স্থানীয় স্কুলে পড়ালেখা শেষ করে ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক হন। এরপর চাচার আর্থিক সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। বার্কলেতে আর্নেস্ট লরেন্সের তত্ত্বাবধানে পিএইচডি সম্পন্ন করে নিউক্লিয়ার ফিশনে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেন। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর কলাম্বিয়াতে দীর্ঘকাল গবেষণা ও শিক্ষকতা করেন।
এনরিকো ফার্মির বিটা-ক্ষয় তত্ত্বের পরীক্ষামূলক প্রমাণ ও আইনস্টাইন-পোডলস্কি-রোজেন প্যারাডক্সের প্রথম পরীক্ষামূলক নিশ্চিতকরণও তাঁর কৃতিত্ব। আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটির প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ১৯৭৫ সালে। একই বছর যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বৈজ্ঞানিক সম্মান ন্যাশনাল মেডেল অব সায়েন্স অর্জন করেন। তাঁর রচিত ‘বিটা ডিকে’ বইটি নিউক্লিয়ার ফিজিকসের অন্যতম নির্ভরযোগ্য রেফারেন্স হিসেবে বিবেচিত।
১৯৯৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুর পরও তাঁর খ্যাতি বেড়েছে। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডাক বিভাগ তাঁর সম্মানে একটি ফরএভার ডাকটিকেট প্রকাশ করে। এই সম্মান এ পর্যন্ত মাত্র আটজন পদার্থবিজ্ঞানী পেয়েছেন, যাদের মধ্যে আলবার্ট আইনস্টাইন, রিচার্ড ফাইনম্যান ও মারিয়া গ্যোপার্ট-মেয়ারের মতো নাম রয়েছে। চিয়েন-শিউং উ ছিলেন 'ম্যাডাম উ' নামে পরিচিত, একজন বাঘা বাঘা বিজ্ঞানী যিনি নোবেল না পেলেও বিশ্ববিজ্ঞানকে অমূল্য উপহার দিয়ে গেছেন।



