১৯৫২ সালে আটলান্টিক মহাসাগরে নিখোঁজ হওয়া একটি প্যান আমেরিকান এয়ারলাইনসের বিমানের ধ্বংসাবশেষ প্রায় ৭৪ বছর পর পুয়ের্তো রিকোর উপকূলে সমুদ্রের গভীরে আবিষ্কৃত হয়েছে। রোবটিক ড্রোন ব্যবহার করে ডিসকভারি চ্যানেলের এয়ার/সি হেরিটেজ ফাউন্ডেশন ও 'এক্সপেডিশন আননোন' এর গবেষক দল এই আবিষ্কার করে। অনুসন্ধানের নেতৃত্বদানকারী রাস ম্যাথিউস জানান, দীর্ঘকাল পরে বিমানটির সন্ধান পেয়ে তারা একই সাথে আনন্দ ও বিষণ্ণতার অনুভব করছেন।
গবেষক দলটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২ হাজার ফুট গভীরে হাই-রেজোলিউশন সোনার প্রযুক্তির মাধ্যমে বিমানের অবস্থান নিশ্চিত করে। একটি বিশ্বমানের প্রযুক্তিসমৃদ্ধ গবেষণা জাহাজ ঘটনাক্রমে ওই নির্দিষ্ট এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় ৪৮ ঘণ্টার জন্য সাহায্য প্রদান করে। ড্রোনটি সমুদ্রের তলদেশ স্ক্যান করে ৩০ ঘণ্টা পর বিমানের ধ্বংসাবশেষের ছবি ধারণ করে ফিরে আসে। ছবিতে প্যান অ্যামের লোগো ও বিমানের নাম তখনও স্পষ্ট দেখা যায়।
১৯৫২ সালের ১১ এপ্রিল ডগলাস ডিসি-৪ মডেলের এই বিমানটি ৬৯ জন যাত্রী ও ক্রু নিয়ে নিউইয়র্কের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল। উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পরেই ডান পাশের দুটি ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়লে পাইলট কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিমানটিকে সমুদ্রে নামাতে বাধ্য হন। প্রাথমিক ধাক্কা থেকে সবাই বেঁচে গেলেও, শেষ পর্যন্ত ১২ জন যাত্রী ও ৫ জন ক্রু সদস্যকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়। বাকি ৫২ জনের মৃত্যু হয়।
প্যান অ্যাম হিস্টরিক্যাল ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা যায়, বিমানে সকলের জন্যই লাইফ জ্যাকেট মজুত ছিল, কিন্তু উড্ডায়নের আগে কোনো ধরনের সেফটি ব্রিফিং বা নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। ভাষাগত সমস্যা ও কী করতে হবে তা অজানা থাকার ফলে যাত্রীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং মাত্র তিন মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে বিমানটি পানিতে তলিয়ে যায়। ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা ডগ মিলার মন্তব্য করেন, উড়ার পূর্বে ক্রুরা যদি নিয়মকানুনগুলো ব্যাখ্যা করতেন, তাহলে যাত্রীরা সহজেই পরিস্থিতি বুঝতে পারতেন।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার ঘটনা পরবর্তীতে বিশ্বব্যাপী বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নিয়মে বড় পরিবর্তন আনতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। এরপর থেকেই বিমানে ওঠার পর লাইফ জ্যাকেট ও জরুরি নির্গমন পথের ব্যবহার যাত্রীদের বুঝিয়ে দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। 'এক্সপেডিশন আননান' অনুষ্ঠানের উপস্থাপক জশ গেটস বলেন, আজ আমরা বিমানে যে নিরাপত্তা বোধ করি, তার মূলে রয়েছে ৭৫ বছর আগেকার সেই দুর্ঘটনার শিক্ষা।
সমুদ্র তলদেশে বিমানের ধ্বংসাবশেষ দ্বিখণ্ডিত অবস্থায় পাওয়া গেছে। ডিসকভারি চ্যানেলের মুখপাত্র স্পষ্ট জানিয়ে দেন, নিহতদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে এই ধ্বংসাবশেষ উত্তোলনের কোনো পরিকল্পনা নেই, কারণ স্থানটি এখন একটি সমাধিস্থল হিসেবে বিবেচিত। এয়ার/সি হেরিটেজ ফাউন্ডেশন এখন পুয়ের্তো রিকো সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট স্থানটির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং নিহতদের স্মরণে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের উদ্যোগ নিচ্ছে।
এত বছর পর বিমানের সন্ধান পাওয়ায় দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া দুজন মানুষ গভীর আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছেন। এদের একজন তখনকার এক তরুণী নার্স, যিনি বর্তমানে ১০২ বছর বয়সী; অন্যজন ছিলেন একটি শিশু, যাকে পানিতে ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল। ফাউন্ডেশন ইতোমধ্যে বেঁচে যাওয়া এই ব্যক্তি ও নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সাথে যোগাযোগ শুরু করেছে।




