ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডের ইতিহাসে উসাইন বোল্টের নাম এক অমর উপাখ্যান। সর্বকালের সেরা স্প্রিন্টার হিসেবে স্বীকৃত বোল্টের জন্মদিনে তাঁর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার এবং ব্যক্তিত্বের কথা স্মরণ করে লিখেছেন সাংবাদিক উৎপল শুভ্র, যিনি অলিম্পিকের বিভিন্ন আসরে বোল্টের সাফল্যের সাক্ষী ছিলেন।

২০০৮ সালের বেইজিং অলিম্পিকের ১০০ মিটার স্প্রিন্টের সেই রাতটি ছিল অবিশ্বাস্য। লেখক বর্ণনা করেন, দৌড়ের প্রায় ২০ মিটার বাকি থাকতেই বোল্ট চারপাশের দিকে তাকাচ্ছিলেন এবং ১০ মিটার বাকি থাকতে নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করে বুক চাপড়ে উদ্‌যাপন শুরু করেন। হেলতে-দুলতে ফিনিশিং লাইন পার হয়েও ইলেকট্রনিক স্কোরবোর্ডে ভেসে ওঠে ৯.৬৯ সেকেন্ডের এক নতুন বিশ্ব রেকর্ড। ৯০ হাজার দর্শকের সামনে ঘটে যাওয়া এই দৃশ্যটি ছিল মায়াবী বিভ্রমের মতো, যা অ্যাথলেটিক্সের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। লেখকের মতে, বেইজিংয়ের ওই দৌড়ে বোল্ট এবং বাকি প্রতিযোগীদের মধ্যে ব্যবধান এতটাই ছিল যে মনে হচ্ছিল দুটি আলাদা দৌড় চলছে—একটি বোল্টের নিজের সাথে নিজের, অন্যটি বাকি সাতজনের মধ্যে।

বোল্টের ক্যারিয়ারের শুরুটা খুব একটা চমকপ্রদ ছিল না। ২০০৪ সালের এথেন্স অলিম্পিকে তিনি ২০০ মিটারের হিটে পঞ্চম হয়ে বিদায় নিয়েছিলেন। তবে এরপর তিনি হয়ে ওঠেন অপ্রতিরোধ্য। ক্রিকেটের ডন ব্র্যাডম্যানের মতো অ্যাথলেটিকসেও বোল্ট একমেবাদ্বিতীয়। তিনি এমন সব সাফল্য অর্জন করেছেন যা আগে কেউ কল্পনাও করেনি। তিনি প্রথম পুরুষ স্প্রিন্টার হিসেবে অলিম্পিকে তিনবার স্প্রিন্ট ডাবল এবং তিনবার ১০০, ২০০ মিটার ও রিলের 'ট্রিপল' জয় করেন। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ এবং অলিম্পিক মিলিয়ে মোট ছয়বার স্প্রিন্ট ডাবল জয়ের অনন্য রেকর্ড তাঁর দখলে। যদিও সতীর্থ নেস্টা কার্টারের ডোপিং কেলেঙ্কারির কারণে তাঁর একটি ট্রিপল পদক ডাবলতে পরিণত হয়, যা অ্যাথলেটিক্স বিশ্বের জন্য এক বড় দুঃখের বিষয়।

বোল্টের বিশেষত্ব কেবল তাঁর গতির মধ্যে নয়, বরং তাঁর আমুদে চরিত্রের মধ্যেও। মাঠের বাইরে সংবাদ সম্মেলনে তাঁর কৌতুকপ্রিয়তা, সাংবাদিকদের সাথে খুনসুটি এবং সহজ-সরল আচরণ তাঁকে সবার কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছিল। নিজেকে 'গ্রেটেস্ট' বা 'লেজেন্ড' বলে ঘোষণা করলেও তা কখনো অহংকারের মতো মনে হয়নি। এর কারণ হিসেবে বোল্ট নিজেই বলেছিলেন, তিনি ট্র্যাকে বারবার তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন এবং ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অত্যন্ত সহজ-সরল।

ডোপিংয়ের কালো ছায়ায় ঢাকা অ্যাথলেটিকসে বোল্ট ছিলেন সত্য ও সুন্দরের প্রতীক। নিষ্কলুষ থেকেও যে দ্রুত দৌড়ানো সম্ভব, তিনি তা প্রমাণ করেছেন। ড্যালি টমসনের মতো কিংবদন্তিরাও মনে করেন, বোল্টের আগমনে এই খেলাটি নতুন প্রাণ পেয়েছে। রিও অলিম্পিকে তাঁর শেষ দৌড়ে তৃতীয় হয়ে শেষ করলেও, তাঁর জুতার স্লোগান 'ফরএভার ফাস্টেস্ট' (চিরকাল দ্রুততম) আজীবন সত্য হয়ে থাকবে। ইতিহাসের এই দ্রুততম মানবের মতো আর কেউ আসবে না বলে বিশ্বাস করেন লেখক।