ব্রিটিশ গণিতবিদ স্যার অ্যান্ড্রু উইলসের দীর্ঘ ও একাগ্র প্রচেষ্টার ফলে ১৯৯৩ সালে অবশেষে প্রমাণিত হয় গণিতের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী রহস্য—ফার্মার শেষ উপপাদ্য। এই ঐতিহাসিক সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৬ সালে তাঁকে গণিতের নোবেলখ্যাত অ্যাবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়; যার অর্থমূল্য ছিল ৬০ লাখ নরওয়েজিয়ান ক্রোন। তাঁর জীবনের এই যাত্রা শুরু হয়েছিল শৈশবেই। মাত্র দশ বছর বয়সে একটি লাইব্রেরিতে একটি বইয়ের সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটে তাঁর। সেখানেই তিনি ফার্মার উপপাদ্যের কথা জানতে পারেন। তখন থেকেই তাঁর মনে জাগে একটি স্বপ্ন—এই সমস্যার সমাধান করা। পরবর্তী সময়ে তিনি গণিতের ওপর ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন ও অধ্যাপনার জীবন বেছে নেন। বিশেষত উপবৃত্তাকার সমীকরণ বিষয়ে তিনি বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন—যা পরবর্তীতে তাঁর কাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।

এই উপপাদ্যের শিকড় প্রোথিত ১৭ শতকে। পেশায় আইনজীবী হলেও পিয়েরে দ্য ফার্মা ছিলেন একজন শৌখিন গণিতবিদ। নিজের পেশাগত দায়িত্ব পালন শেষে তিনি গণিত ও সংখ্যাতত্ত্বের বিভিন্ন গ্রন্থ পাঠে সময় কাটাতেন। ১৬৩৭ সালের এক রাতে তিনি গ্রিক গণিতজ্ঞ ডায়োফান্টাসের ‘এ্যারিথমেটিকা’ গ্রন্থটি পড়ছিলেন। যে পৃষ্ঠায় তাঁর চোখ পড়েছিল, সেখানে ত্রয়ী সংখ্যার আলোচনা ছিল। উদাহরণ হিসেবে ৩, ৪ ও ৫—যেখানে ৩-এর বর্গ ৯, ৪-এর বর্গ ১৬; দুটো যোগ করলে ২৫, যা ৫-এর বর্গের সমান। এ ধরনের সম্পর্ককে পিথাগোরীয় ত্রয়ী বলা হয়। ফার্মা ভাবলেন, এই সম্পর্ক কি কেবল বর্গের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ? তিনি অঙ্ক কষে দেখলেন, যদি সংখ্যার ঘাত বা পাওয়ার ২-এর বেশি হয়—অর্থাৎ ৩, ৪ বা তারও বেশি—তবে এমন কোনো ত্রয়ী সংখ্যা খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। তিনি নিশ্চিত হন যে, xⁿ + yⁿ = zⁿ সমীকরণে ‘n’-এর মান ২-এর বেশি হলে কোনো পূর্ণসংখ্যা সমাধান থাকতে পারে না। কিন্তু একটি সিদ্ধান্তকে উপপাদ্য হিসেবে ঘোষণা করতে হলে কেবল কয়েকটি উদাহরণ নয়, বরং সুনির্দিষ্ট গাণিতিক যুক্তি বা তত্ত্বের প্রয়োজন হয়। সংখ্যার তো শেষ নেই; ঘাতেরও সীমা নেই। তাই একের পর এক সংখ্যা পরীক্ষা করে কখনোই বলা যাবে না যে ‘এটি কখনো হতে পারে না।’ ফার্মা এই সমস্যার একটি চমৎকার প্রমাণ খুঁজে পেয়েছিলেন বলে দাবি করেন, কিন্তু ‘এ্যারিথমেটিকা’-র মার্জিনে তিনি কেবল লিখে রাখেন, প্রমাণটি এত দীর্ঘ যে এই ক্ষুদ্র পরিসরে তা আঁটে না। এভাবেই তাঁর নামকরণ হয় ‘ফার্মার শেষ উপপাদ্য’—কারণ তাঁর দেওয়া অন্যান্য উপপাদ্য প্রমাণিত হলেও এই একটি কোনোভাবেই প্রমাণ করা যাচ্ছিল না।

পরবর্তী ৩৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের বাঘা বাঘা গণিতবিদরা এই উপপাদ্যের পেছনে নিরলস পরিশ্রম করেন। ১৮ শতকের বিখ্যাত গণিতবিদ ও বিজ্ঞানী লিওনার্ড অয়লার—যিনি কোনো কাগজপত্র ছাড়াই জটিল সমস্যা মাথার মধ্যেই সমাধান করতে সক্ষম ছিলেন—তিনিও এই উপপাদ্যের পেছনে কাজ করেন, কিন্তু চূড়ান্ত সাফল্য পাননি। সোফি জার্মেইন, গুস্তাভ ডিরিশেট, আন্দ্রেঁ লেগেন্দ্রে, গ্যাব্রিয়েল লামে, তানিয়ামা ও শিমুরা, আন্দ্রে ওয়াইল, গারহার্ড ফ্রে এবং কেন রিবেটসহ অনেক গণিতবিদ এই সমস্যা নিয়ে কাজ করেন। কেউই সম্পূর্ণ প্রমাণ দাঁড় করাতে না পারলেও, তাঁদের প্রচেষ্টায় ধাপে ধাপে অগ্রগতি ঘটে। বিশেষ করে জাপানি গণিতবিদ তানিয়ামা ও শিমুরা গণিতের দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন শাখা—মডুলার ফর্ম ও উপবৃত্তাকার সমীকরণ—নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁরা এই দুটি শাখার মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক আবিষ্কার করে একটি গাণিতিক অনুমান করেন। পরবর্তীতে জার্মান গণিতবিদ গারহার্ড ফ্রে প্রমাণ করেন, যদি তানিয়ামা-শিমুরার এই অনুমান সত্যি হয়, তবে ফার্মার উপপাদ্যও স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণিত হবে। অর্থাৎ, সরাসরি উপপাদ্যটি প্রমাণের পরিবর্তে অন্য একটি পথ তৈরি হয়।

উইলস বুঝতে পারেন, উপবৃত্তাকার সমীকরণে তাঁর দক্ষতা এবং তানিয়ামা-শিমুরার অনুমানের সঙ্গে এর সম্পর্ক—এই দুটি মিলিয়ে তাঁর জন্য একটি সুযোগ তৈরি করেছে। তিনি নিজের ক্যারিয়ার ও ব্যক্তিগত জীবন থেকে ধীরে ধীরে সরে এসে গোপনে এই কাজে মনোনিবেশ করেন। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর—এই একাগ্র প্রচেষ্টার ফলেই তিনি তানিয়ামা-শিমুরার অনুমান প্রমাণ করতে সক্ষম হন। এর সঙ্গে সঙ্গে প্রমাণিত হয়ে যায় ফার্মার ৩৫০ বছরের পুরোনো উপপাদ্যও। প্রাথমিকভাবে পিয়ার রিভিউ কমিটিতে তাঁর প্রমাণ জমা দেওয়ার পর একটি ছোট ত্রুটি ধরা পড়ে। কিন্তু উইলস তা সংশোধন করে চূড়ান্ত রূপ দেন। অবশেষে গণিতের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় রচিত হয়—যেখানে একটি মার্জিনের টীকায় লুকানো রহস্যের অবসান ঘটে দীর্ঘ তিন শতাব্দীর অপেক্ষার পর।