জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট তীব্র তাপপ্রবাহ দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলোর অর্থনীতিতে যে চাপ তৈরি করছে, তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে ঢাকার ক্ষেত্রে। সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এই হতাশাব্যঞ্জক পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে তাপমাত্রাজনিত কারণে রাজধানীতে যে পরিমাণ কর্মঘণ্টা নষ্ট হবে, তা ৪ লাখ ৬৫ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমতুল্য। এটি ওই সময়ে ঢাকার বাৎসরিক মোট কর্মঘণ্টার প্রায় ৩ শতাংশ।
‘বসবাসযোগ্য ভবিষ্যৎ: দক্ষিণ এশিয়ার শহরে চরম তাপের মধ্যে কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি সুরক্ষার উপায়’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জলবায়ু পরির্ননের ধাক্কা বাড়তে থাকলে ঢাকার এই সংকট আরও গভীর হবে। ২০৫০ সালে তাপ্রবাহজনিত এই ক্ষতি ৭ লাখ ৮ হাজার এবং ২০৮০ সালে প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার পূর্ণকালীন চাকরি নষ্টের সমতুল্য হবে। ২০৮০ সালে এসে কর্মঘণ্টা হারানোর হার দাঁড়াবে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। প্রতিবেদনে তাপমাত্রার এই উর্ধ্বগতি কীভাবে বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবন-জীবিকাকে বিপর্যস্ত করছে, সেটি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে দক্ষিণ এশিয়ার আটটি উল্লেখযোগ্য মহানগরী—ঢাকা, নয়াদিল্লি, কলকাতা, মুম্বাই, চেন্নাই, আহমেদাবাদ, সুরাট ও বারাণসী—পরিার করা হয়েছে। দেখা গেছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষতির তালিকায় ঢাকার পরেই অবস্থান করছে কলকাতা ও নয়াদিল্লির, যেখানে ক্ষতির পরিমাণ হবে যথাক্রমে প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার এবং ২ লাখ ৬৬ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমতুল্য। নয়াদিল্লির পরে রয়েছে মুম্বাই (২ লাখ ৪ হাজার), চেন্নাই (১ লাখ ৪১ হাজার), আহমেদাবাদ (৯৯ হাজার), সুরাট (৯৭ হাজার) ও বারাণসী (৫১ হাজার)।
সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর থাবা স্পষ্ট। ২০২৪ সালে একা বাংলাদেশের অর্থনীতিরই আনুমানিক ১৩০ কোটি থেকে ১৮০ কোটি ডলারের ক্ষতি সাধন করেছে তাপপ্রবাহ, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) শূন্য দশমিক ৩ থেকে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশের সমপরিমাণ। তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের গণ্ডি ছাড়িয়ে গেলেই এই ক্ষতি আরও দ্রুত গতিতে বাড়তে থাকে। বিশ্বব্যাংক সতর্ক করে জানিয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় চরম তাপপ্রবাহ এখন আরও ঘন ঘন, তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে জীবন ও জীবিকার ওপর।
তৈরি পোশাক খাতের রূপান্তরে বাংলাদেশের ভূমিকার প্রশংসাও করা হয়েছে প্রতিবেদনটিতে। বলা হয়েছে, চরম তাপের প্রভাবে উৎপাদনশীলতা কমতে শুরু করা দক্ষিণ এশিয়ার গার্মেন্টস শিল্পে স্বল্পসুদের ঋণ সহায়তা কীভাবে পরিবর্তন আনতে পারে, তার উদাহরণ হলো বাংলাদেশ। ২০১৬ সালে চালু হওয়া 'গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড' বা সবুজ রূপান্তর তহবিলের বদৌলতে ২০২৫ সালের শেষে দেশে ২৭০-এরও বেশি পোশাক কারখানা এলইডি সনদ পেয়েছে। তবে আইএলও ও আইএফসি’র বিশ্লেষণ বলছে, কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার পোশাক খাতের সম্মিলিত রপ্তানি ক্ষতি ৬ হাজার ৫৮০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
তাপপ্রবাহের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। ভারতের আহমেদাবাদে ২০১৩ সালে চালু করা 'হিট অ্যাকশন প্ল্যান'-এর উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে, এর ফলে প্রথম দুই বছরেই তাপপ্রবাহজনিত মৃত্যু ৪৭ শতাংশ হ্রাস পায় এবং প্রায় ২,৩৮০টি প্রাণ রক্ষা পায়। এছাড়া তাপপ্রবাহের পূর্ব সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় প্রতি ১ ডলার বিনিয়োগের বিপরীতে প্রায় ৫০ ডলারের সমমূল্যের সুবিধা পাওয়া যায় বলে বিশ্লেষণে জানা গেছে।
জার্মানভিত্তিক সংস্থা অ্যাডেলফি গ্লোবালের ‘হিট, হেলথ অ্যান্ড দ্য ইনক্রিজিং কস্টস অব লিভিং’ শীর্ষক আরেক প্রতিবেদনের তথ্য জানায়, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের কৃষি ও নির্মাণ খাতের শ্রমিকেরা বছরে গড়ে ২৩ দশমিক ৭৫ কর্মদিবসের সমান কাজ হারাতে পারেন। বর্তমানে এ দুই খাতে কর্মঘণ্টা হারানোর হার ৬ দশমিক ২৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০৩০ সালে ৯ দশমিক ৫৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। অনানুষ্ঠানিক খাতের লাখ লাখ শ্রমিক, যাদের বেতনসহ ছুটি বা স্বাস্থ্যবিমা নেই, তারাই সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মুখে পড়বেন। এই পরিস্থিতি চিকিৎসা ব্যয়ের ধাক্কায় বিপুল মানুষের নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে, যা ইতোমধ্যে অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের মতো বিশেষজ্ঞরাও গভীর উদ্বেগের সাথে পর্যবেক্ষণ করছেন।




