চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ থানার অন্তর্গত হামজারবাগ এলাকায় একটি বহুতল ভবনের প্রবেশপথে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর এক সপ্তাহ অতিক্রম করলেও এখনো কোনো সন্দেহভাজনকে আটক করতে সক্ষম হয়নি পুলিশ। এই ঘটনার পর থেকেই এলাকাবাসীর মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে এবং স্থানীয়রা প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করতে ভয় পাচ্ছেন।

১১ আগস্ট রাতে নগরের হামজারবাগ এলাকায় রুনা টাওয়ার নামের ১১ তলা ভবনের ফটকে হামলাকারীরা গুলি চালায়। এর আগে দুপুর আনুমানিক ১২টার দিকে ভবনের মালিকের পুত্রের মুঠোফোনে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে একটি কণ্ঠবার্তা পাঠিয়ে এক ঘণ্টার চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা পরিশোধের দাবি জানানো হয়। বার্তায় স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা না দিলে পরিবারের সদস্যদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হবে। ঘটনার পর অজ্ঞাতনামা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা দায়ের করা হয়।

ঘটনার পর গত শুক্রবার ঘটনাস্থলে গেলে ভবনের মালিক পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কোনোভাবেই যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। ভবনের নিচতলাসহ আশপাশের এলাকায় নতুন করে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের কাজ চলমান থাকতে দেখা যায়। নিরাপত্তারক্ষী কামাল হোসেন প্রথম আলোকে জানান, ঘটনার পর থেকেই সবাই ভয়াবহ উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন। গুলির ঘটনা নিয়ে কেউ কোনো কথা বলতে রাজি হচ্ছেন না বলে তিনি উল্লেখ করেন।

যে ভবনের গেটে গুলি করা হয়েছে, তার নাম রুনা টাওয়ার। ১১ তলা ওই ভবনের মালিক মোহাম্মদ ইউসুফ। তাঁর দুই পুত্রই প্রবাসে ব্যবসা করেন এবং তাঁদের গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি এলাকায়। সম্প্রতি শওকত নামে এক পুত্র দেশে ফিরে আসেন এবং তাঁর মুঠোফোনেই ওই হুমকিসংবলিত বার্তা পাঠানো হয়। বার্তায় বলা হয়, শওকতের পিতা, ভাইসহ পরিবারের সদস্যরা কোথায় কী করছেন এবং কার কোথায় কী সম্পদ রয়েছে—সবকিছুই তাদের জানা। ‘বড় ভাইয়ের’ নির্দেশ মেনে এক ঘণ্টার মধ্যে টাকা পরিশোধ করতে হবে, অন্যথায় শওকতকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। উল্লেখযোগ্য যে, ইউসুফ নিষিদ্ধ ঘোষিত স্বেচ্ছাসেবক লীগের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমানের শ্বশুর। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দুই দিন পর আজিজকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয় এবং তিনি এখনও বন্দি রয়েছেন।

পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহেদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তিনি আরও জানান, অভিযুক্তরা সন্ত্রাসী চক্রের সদস্য। তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম-পরিচয় এখনই প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এই ঘটনার পূর্বে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় একই চক্রের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির একাধিক অভিযোগ ওঠে। গত ১৩ জুলাই নগরের দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের বড় দিঘিরপাড় এলাকায় ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিনের নির্মাণাধীন ভবনে ২০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। এতে সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমনের অনুসারীদের নাম উঠে আসে। ওই ঘটনায় মামলা হওয়ার পর ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির ঘটনাও ঘটে। এছাড়া গত ১৩ জুন বাকলিয়া এক্সেস রোডে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ডিডিএনে দুই কোটি টাকা চাঁদার দাবিতে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগও একই চক্রের বিরুদ্ধে রয়েছে। উক্ত দুই ঘটনার পর মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে চাঁদাবাজি বন্ধ ও ইমনকে গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয়। অভিযোগ রয়েছে যে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ইমন চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে ভারতে পালানোর সময় গত ২৯ জুলাই যশোর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।