সুনামগঞ্জ জেলার মধ্যনগর উপজেলার দক্ষিণ আমজোড়া নুরুন্নাহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তীব্র শিক্ষক সংকট দেখা দিয়েছে। বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে মাত্র একজন শিক্ষক কর্মরত আছেন, যিনি একাই ৫০ জন শিক্ষার্থীকে পাঠদানের দায়িত্ব পালন করছেন। শ্রেণিকক্ষ ছয়টি হলেও একসঙ্গে সব ক্লাস নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না; ফলে একটি ক্লাস চলাকালে অন্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। গত ১ জুলাই থেকে এই পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন বছর ধরে শিক্ষক সংকট চলছে। ২০২০ সালে এপ্রিল মাসের পর থেকে কাগজে-কলমে একজন মাত্র শিক্ষকের পদায়ন ছিল। বর্তমানে বিদ্যালয়টির নিজস্ব কোনো শিক্ষক কর্মরত নেই। এই অবস্থায় পাশের শাহাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সহকারী শিক্ষক শেখ মহসীন কবীর এবং রামদীঘা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সহকারী শিক্ষক পারভীন আক্তারকে সংযুক্তি দেওয়া হয়েছিল। তবে শেখ মহসীন কবীর দ্বিতীয় মেয়াদের সংযুক্তি সত্ত্বেও এখনো যোগ দেননি। ফলে পারভীন আক্তারকেই এককভাবে পুরো বিদ্যালয় সামলাতে হচ্ছে।

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জান্নাতুল ফেরদৌস মাতৃত্বকালীন ছুটিতে রয়েছেন, যা আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে। তিনি জানান, বিদ্যালয়টির অবস্থান দুর্গম হওয়ায় এবং থাকার মতো পরিবেশ না থাকায় কোনো শিক্ষক সেখানে দীর্ঘমেয়াদে থাকতে চান না। বর্ষাকালে পৌঁছাতে নৌকাই একমাত্র ভরসা।

শিক্ষক পারভীন আক্তার জানান, তাকে একাই ৫০ জন শিক্ষার্থীকে পাঠদান করতে হচ্ছে, যা সঠিকভাবে সম্ভব হচ্ছে না। এতে তিনি হিমশিম খাচ্ছেন। অন্যদিকে শেখ মহসীন কবীর বলেন, তার নিজ বিদ্যালয় থেকে দক্ষিণ আমজোড়ার দূরত্ব প্রায় তিন কিলোমিটার এবং যাতায়াত ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। তাই তিনি নিজ বিদ্যালয়েই পাঠদান করছেন এবং সংযুক্তির আদেশ বাতিলের জন্য আবেদন করবেন।

একই চিত্র উপজেলার অন্যান্য বিদ্যালয়েও। মধ্যনগর উপজেলার চারটি ইউনিয়নে মোট ৮৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি বিদ্যালয়ে নিয়মিত শিক্ষক মাত্র একজন করে। এগুলো হলো দক্ষিণ আমজোড়া নুরুন্নাহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আমজোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রূপনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দরাপপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাছুয়াকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এসব বিদ্যালয়ে পাশের বিদ্যালয় থেকে একজন করে শিক্ষক সংযুক্তি দেওয়া হয়েছে। আমজোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে ৭৩ জন শিক্ষার্থী থাকলেও গত বছর ছিল ১১৩ জন। সেখানে তিন বছর ধরে সহকারী শিক্ষক ছৈয়দা সাদিয়া আক্তার একাই কর্মরত।

উপজেলায় সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ৩৮৬টি, যার মধ্যে ৭৭টি পদ শূন্য। প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে ৩৮টি বিদ্যালয়ে। হাওরবেষ্টিত এই উপজেলায় বর্ষাকালে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। শিক্ষকসংকটের কারণে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন অভিভাবকরা। বিদ্যালয়ের চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের অভিভাবক জসীম মিয়া ও মজনু মিয়া জানান, পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীরা লেখাপড়ার বদলে হইহুল্লোড় করেই সময় কাটায়। উপস্থিতির হারও কম—৫০ জনের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৩৫ জন আসে।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা দিলোয়ার হোসেন বলেন, এটি হাওরবেষ্টিত এলাকা হওয়ায় বর্ষাকালে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম থাকে। তিনি জানান, যাবতীয় বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অবগত রয়েছে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহন লাল জানান, প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি ও সহকারী শিক্ষকদের পদায়নের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।