আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তেলের দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী। ২০২৬ সালের ৬ নভেম্বর ইস্টার্ন টাইম সকাল ৭টা ১৫ মিনিটের হিসাব অনুযায়ী, বৈশ্বিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য ব্যারেল প্রতি ১০২.০৫ ডলারে পৌঁছেছে। আগের দিনের তুলনায় তেলের দাম ২.৫৩ ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে। সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, ঠিক এক বছর আগে তেলের দাম ছিল ব্যারেল প্রতি ৬৪.০৪ ডলার, যা বর্তমানে প্রায় ৫৯.৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে গত এক মাসের তুলনায় বর্তমান মূল্য ১.২৮ শতাংশ কম।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দামের নির্ভুল পূর্বাভাস দেওয়া অত্যন্ত কঠিন। মূলত চাহিদা এবং জোগানের ভারসাম্য এখানে প্রধান ভূমিকা পালন করে। তবে অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা, যুদ্ধ এবং বড় ধরনের বৈশ্বিক বিশৃঙ্খলার মতো বিষয়গুলো তেলের দামের গতিপথ দ্রুত পরিবর্তন করে দেয়। অপরিশোধিত তেলের এই দাম সরাসরি পেট্রোল পাম্পের জ্বালানির দামকে প্রভাবিত করে, যদিও রিফাইনিং খরচ, পরিবহন ব্যয়, কর এবং স্থানীয় স্টেশনের মুনাফা যুক্ত হওয়ার কারণে চূড়ান্ত দাম নির্ধারিত হয়। সাধারণত তেলের দাম বাড়লে জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়ে, কিন্তু তেলের দাম কমলে পাম্পের দাম খুব ধীরে নামে, যাকে বিশেষজ্ঞরা 'রকেট এবং ফেদার' ট্রেন্ড বলে অভিহিত করেন।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে 'স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ' রয়েছে। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় জরুরি প্রয়োজনে এই মজুদ ব্যবহার করা হয়, যাতে সরবরাহ সংকটের কারণে দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে না যায় এবং গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও জনসেবা সচল থাকে। এছাড়া তেলের দামের সাথে প্রাকৃতিক গ্যাসের দামের একটি গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। তেলের দাম অত্যধিক বেড়ে গেলে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান বিকল্প হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার বাড়িয়ে দেয়, ফলে গ্যাসের চাহিদাও বৃদ্ধি পায়।
ঐতিহাসিকভাবে তেলের বাজার অত্যন্ত অস্থিতিশীল। বিশ্বজুড়ে ব্রেন্ট ক্রুড এবং উত্তর আমেরিকায় ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI) প্রধান মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয়। গত কয়েক দশকের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৭০-এর দশকের প্রথম দিকে মধ্যপ্রাচ্যের রপ্তানি সীমাবদ্ধতার কারণে তেলের দাম ব্যাপক বেড়েছিল। আবার ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে চাহিদা হ্রাস ও বিকল্প উৎপাদনকারীদের আগমনে দাম কমেছিল। ২০০৮ সালের বিশ্ব আর্থিক মন্দা এবং ২০২০ সালে কোভিড-১৯ লকডাউনের সময় চাহিদা ধসে পড়ায় তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ২০ ডলারের নিচে নেমে গিয়েছিল।
বর্তমান বাজারে তেলের দাম নির্ধারণে ওপেকের (OPEC+) সিদ্ধান্ত এবং ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি বড় প্রভাব ফেলে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ড্রিলিং নীতিও গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন আর্কটিক ন্যাশনাল ওয়াইল্ডলাইফ রিফিউজ এলাকার ১.৫ মিলিয়ন একর জমি তেল ও গ্যাস লিজ দেওয়ার জন্য উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়, যা বাইডেন প্রশাসনের সীমাবদ্ধকারী নীতির বিপরীত ছিল। অন্যদিকে, মার্কিন শেলে (Shale) তেল উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়লে বাজারে জোগান বৃদ্ধি পায়, যা দামের অস্বাভাবিক উর্ধ্বগতি রোধ করতে সহায়তা করে। পরিশেষে, তেলের দাম বাড়লে তা মুদ্রাস্ফীতি ত্বরান্বিত করে। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।




