অনেকেরই রাতের বেলা বিছানায় শুয়ে দীর্ঘ সময় জেগে থাকার সমস্যা থাকে। আমরা মনে করি সারাদিনের ক্লান্তির পর বিছানায় গেলেই ঘুম চলে আসবে, কিন্তু প্রশান্তিময় গভীর ঘুমের জন্য শরীর ও মনকে বিশেষভাবে প্রস্তুত করতে হয়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, কিছু সুশৃঙ্খল অভ্যাস মেনে চললে ঘুমের মান উন্নত করা সম্ভব। নিচে সেই সাতটি কার্যকর নিয়ম আলোচনা করা হলো:

১. শরীরকে একটি নির্দিষ্ট ছকে অভ্যস্ত করা: মানুষের শরীরে 'সার্কাডিয়ান রিদম' নামক একটি প্রাকৃতিক ঘড়ি থাকে। এটি সচল রাখতে ছুটির দিনসহ সপ্তাহের প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানো এবং ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করতে হবে। এছাড়া বিকেলের দিকে দীর্ঘ সময় ঘুমানো এড়িয়ে চলা উচিত; খুব ক্লান্ত বোধ করলে দুপুরে সর্বোচ্চ ২০-৩০ মিনিটের একটি 'পাওয়ার ন্যাপ' নেওয়া যেতে পারে।

২. আলো ও অন্ধকারের সঠিক ব্যবহার: দিনের বেলা অন্তত ১৫-২০ মিনিট সূর্যের আলো গায়ে লাগানো জরুরি, যা রাতের ঘুমের মান বাড়ায়। অন্যদিকে, ঘুমানোর ১-২ ঘণ্টা আগে মোবাইল, ল্যাপটপ বা টিভির মতো ইলেকট্রনিক ডিভাইসের নীল আলো থেকে দূরে থাকা উচিত। এই নীল আলো ঘুমের হরমোন 'মেলাটোনিন' উৎপাদনে বাধা দেয়, যা অনিদ্রার অন্যতম কারণ হতে পারে।

৩. শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ: ঘুমের আগে শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা হ্রাস পেলে দ্রুত ঘুম আসে। তাই শোবার ঘরের তাপমাত্রা কিছুটা শীতল (১৮-২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) রাখা শ্রেয়। এছাড়া ঘুমানোর ১-২ ঘণ্টা আগে হালকা গরম জলে ১০ মিনিট গোসল করলে শরীর ভেতর থেকে দ্রুত ঠান্ডা হয়, যা গভীর ঘুমে সহায়ক।

৪. শোবার ঘরের পরিবেশ উন্নয়ন: শোবার ঘরটি কেবল বিশ্রাম ও ঘুমের জন্যই নির্দিষ্ট রাখা উচিত, এখানে অফিসের কাজ করা যাবে না। ভারী পর্দার মাধ্যমে ঘর অন্ধকার রাখা এবং বাইরের শব্দ কমাতে মৃদু ফ্যান বা হোয়াইট নয়েজ মেশিন ব্যবহার করা যেতে পারে। বিছানার ক্ষেত্রে খুব নরম তোশকের বদলে মাঝারি শক্ত তোশক এবং আরামদায়ক ভারী কম্বল ব্যবহার করা দুশ্চিন্তা কমিয়ে দ্রুত ঘুমাতে সাহায্য করে।

৫. খাদ্যাভ্যাস ও সতর্কবার্তা: ঘুমানোর অন্তত ৩ ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করা উচিত এবং ভারী বা তেল-মসলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা প্রয়োজন। রাতে বারবার প্রস্রাবের বেগ যেন না হয়, সেজন্য ঘুমানোর ১-২ ঘণ্টা আগে পানি, চা বা কফি পানের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া উচিত। বিশেষ করে দুপুর ২টার পর ক্যাফেইন যুক্ত পানীয় এবং নিকোটিন বা ধূমপান বর্জন করা ঘুমের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

৬. মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখা: মন অস্থির থাকলে ঘুম আসা কঠিন। গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়ামের মাধ্যমে মনকে শান্ত করা যেতে পারে। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে বারবার ঘড়ি দেখে হিসাব না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, কারণ এটি মস্তিষ্কে উদ্বেগ তৈরি করে। এছাড়া 'আমাকে এখনই ঘুমাতে হবে'—এমন মানসিক চাপ না নিয়ে বরং বিপরীত চিন্তা করলে অবচেতনভাবেই ঘুম চলে আসে। আগামীদিনের কাজের তালিকা আগে লিখে রাখলে দুশ্চিন্তা কমে।

৭. চিকিৎসকের পরামর্শ ও থেরাপি: দীর্ঘমেয়াদী সমস্যায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে মেলাটোনিন বা ম্যাগনেসিয়াম সাপ্লিমেন্ট নেওয়া যেতে পারে। অনিদ্রার জন্য ওষুধের চেয়ে 'সিবিটি' নামক মনস্তাত্ত্বিক থেরাপি অধিক নিরাপদ ও কার্যকর। তবে তিন সপ্তাহ নিয়ম মেনে চলার পরও সমস্যা না কমলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত, কারণ এটি 'স্লিপ অ্যাপনিয়া'র মতো কোনো রোগের লক্ষণ হতে পারে।