অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে অনৈতিক সিন্ডিকেট, দুর্নীতি কিংবা নোট বাণিজ্যের কোনো স্থান থাকবে না বলে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। শুক্রবার সকালে ঢাকার একটি হোটেলে আইন কর্মকর্তাদের পেশাগত নৈতিকতা, স্বাধীনতা এবং দায়িত্বশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এই কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

অনুষ্ঠানে তিনি জোর দিয়ে বলেন, তাঁর দায়িত্ব পালনকালে কার্যালয়ের ভেতরে কোনো অসাধু গোষ্ঠী বা দুর্নীতি চক্র গড়ে উঠতে দেওয়া হবে না। রাষ্ট্রীয় মামলা পরিচালনায় কারসাজি করা, আদালতের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করা কিংবা দুর্নীতির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করলে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। প্রয়োজনে এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপের পাশাপাশি ফৌজদারি মামলা করার সতর্কবার্তাও দেন তিনি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোরতার উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, গত ১৬ এপ্রিল সরকারি নিয়োগ সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ রিট মামলার ফাইল ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রাখার দায়ে এক অফিস সহায়কের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে এবং তাকে পুলিশের হাতে হস্তান্তর করা হয়েছে। এছাড়া কিছু আইন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পাওয়া বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগের ভিত্তিতেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

অ্যাটর্নি জেনারেল কাজল দাবি করেন, ৩১ জুলাই নতুন আইন কর্মকর্তারা দায়িত্ব নেওয়ার পর কার্যালয়ে আগে প্রচলিত নোট বাণিজ্য ও সেকশনে দুর্নীতির অভিযোগগুলো অনেকলাংশে কমে এসেছে। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, রাষ্ট্রের আইন কর্মকর্তারা মূলত জনস্বার্থের আইনজীবী। কেবল সরকারের পক্ষে মামলা জেতা বা সাজা নিশ্চিত করাই তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়, বরং সংবিধান, আদালত এবং বৃহত্তর জনস্বার্থের প্রতি তাঁদের সর্বোচ্চ আনুগত্য থাকতে হবে। প্রতিটি আইনি আবেদনের পেছনে মানুষের জীবন, মর্যাদা ও স্বাধীনতা জড়িত থাকে, তাই প্রক্রিয়াগত বিলম্ব এড়িয়ে নাগরিকবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

ন্যায়বিচারের উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, বিচারিক আদালতে ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড হলেও উচ্চ আদালতে আপিল শুনানির সময় রাষ্ট্রপক্ষ কেবল সাজা নিশ্চিত করার কথা ভাবেনি, বরং নিরপরাধদের সুরক্ষার বিষয়টিও বিবেচনায় নিয়েছে। ফলে হাইকোর্ট ১০ জনকে খালাস এবং চারজনের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেছে। তাঁর মতে, দেশের প্রতিটি নাগরিকই তাঁদের মক্কেল এবং নিরপরাধ মানুষকে রক্ষা করাও তাঁদের অন্যতম দায়িত্ব।

জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (UNODC)-এর দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক কার্যালয়ের আয়োজনে এবং ইউএনডিপি (UNDP) বাংলাদেশের সহায়তায় এই কর্মশালাটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে ১৬০ জন আইন কর্মকর্তা অংশগ্রহণ করছেন। প্রশিক্ষক প্যানেলে রয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন, থাইল্যান্ডের প্রসিকিউটর ওয়ারানথর্ন ওয়ানিচথাওয়ার্ন এবং মালদ্বীপের প্রসিকিউটর মারিয়াম সিমহা মুস্তফা রাশিদ।

কর্মশালায় ইউএনওডিসির আঞ্চলিক প্রতিনিধি ক্রিস্টিয়ান হোলজ প্রসিকিউটরদের স্বতন্ত্র ও নিরপেক্ষ ভূমিকার কথা বলেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, রাজনৈতিক চাপ বা জনমতের বাইরে থেকে সঠিক কাজটি করাই একজন প্রসিকিউটরের প্রধান দায়িত্ব। অন্যদিকে, ইউএনডিপি বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফেন রড্রিকস বিচারব্যবস্থায় মানুষের মর্যাদা ও সমান আচরণের কথা বলেন। তিনি জানান, ইউএনডিপি এক দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের বিচার খাতের আধুনিকায়ন, মামলাজট কমানো এবং ডিজিটাল কোর্ট স্থাপনে কাজ করছে।

অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক তাঁর বক্তব্যে বলেন, এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কার্যালয় সর্বোচ্চ নৈতিক মান বজায় রেখে বিচার বিভাগের মর্যাদা সমুন্নত রাখবে। দুই দিনের এই কর্মশালায় মূলত প্রসিকিউটরদের নৈতিকতা, সাক্ষ্য-প্রমাণের নির্ভরযোগ্যতা, গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের আইনি সুরক্ষা এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে।