আধুনিক জীবনযাত্রায় আমরা প্রতিদিন আবহাওয়া দেখা, বিল পরিশোধ বা ইমেল আদান-প্রদানের মতো কাজগুলো করি, যার নেপথ্যে সক্রিয় থাকে অসংখ্য ডেটা সেন্টার। আমাদের ব্যাংক, হাসপাতাল, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) যাবতীয় সরঞ্জাম এই পরিকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। তবে দৃশ্যত সাধারণ মনে হলেও, এই কেন্দ্রগুলোর নির্মাণ নিয়ে সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে তীব্র জনরোষ দেখা দিচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার পিনাল কাউন্টিতে বিপুল সংখ্যক বাসিন্দার বিরোধিতার মুখে একটি বড় ডেটা সেন্টার প্রজেক্ট বাতিল করা হয়েছে। একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গেছে ফ্লোরিডা, ভার্জিনিয়া এবং নর্থ ক্যারোলাইনাতেও।

ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে পাওয়ার সিস্টেম বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত একজন পেশাদারের মতে, এই ক্ষোভের পেছনে কিছু যৌক্তিক কারণ থাকলেও লক্ষ্য অনেক সময় ভুল দিকে থাকে। বিশেষ করে পানির ব্যবহার নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি। যদিও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে, বিশ্বব্যাপী মিঠা পানির প্রায় ৭২ শতাংশ ব্যবহৃত হয় কৃষিকাজে, যেখানে ডেটা সেন্টারের অবদান নগণ্য। তবে স্থানীয় পর্যায়ে এটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। লরেন্স বার্কলে ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে মার্কিন ডেটা সেন্টারগুলো শীতলকরণের জন্য প্রায় ১৭ বিলিয়ন গ্যালন পানি ব্যবহার করেছে, যা ২০২৮ সালের মধ্যে দুই থেকে চার গুণ বৃদ্ধি পেতে পারে। এছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত পানির পরিমাণ এর চেয়ে প্রায় ১২ গুণ বেশি, যা কোম্পানিগুলো সাধারণত প্রকাশ করে না। তবে ব্রিটেনের শীতল জলবায়ু এবং আধুনিক কুলিং সিস্টেমের কারণে সেখানে পানির ব্যবহার অনেক কম, যা মোট নন-হাউসহোল্ড পানি ব্যবহারের মাত্র ০.২ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞের মতে, এই অসন্তোষের একটি প্রধান কারণ হলো সুবিধা এবং খরচের অসম বণ্টন। ক্লাউড সার্ভিস বা এআই-এর সুবিধা কোটি কোটি মানুষ পেলেও, এর পরিবেশগত এবং অবকাঠামোগত চাপ বহন করতে হয় নির্দিষ্ট একটি শহরের বাসিন্দাদের। জানলাবিহীন বিশাল এবং কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টিত এই ভবনগুলো স্থানীয়দের কাছে রহস্যময় মনে হয়। যখন কোম্পানিগুলো পানি বা বিদ্যুতের ব্যবহারের সঠিক তথ্য দেয় না, তখন রাজনৈতিক নেতারা সেই শূন্যস্থানটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়ের কথা বলে পূরণ করেন।

এই আস্থার সংকট দূর করতে তিনি কিছু নির্দিষ্ট পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রথমত, প্রতিটি সাইটে পানি ও বিদ্যুতের ব্যবহারের সঠিক হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় পরিবেশের কথা মাথায় রেখে নকশা তৈরি করতে হবে; মরুভূমি এবং জলাভূমির জন্য একই কুলিং সিস্টেম ব্যবহার করা ভুল। তৃতীয়ত, বিদ্যুতের সংস্থানের বিষয়ে স্বচ্ছ পরিকল্পনা থাকতে হবে, যাতে অস্থায়ী ডিজেল বা গ্যাস জেনারেটরের ওপর দীর্ঘকাল নির্ভর করতে না হয়। সবশেষে, স্থানীয় বাসিন্দাদের অংশীদার হিসেবে গণ্য করে প্রকল্পের শুরুতেই তাদের মতামত নেওয়া এবং প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কর্মসংস্থান ও কর রাজস্বের সঠিক হিসাব প্রদান করা প্রয়োজন।

তবে প্রযুক্তির উন্নতির কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, নতুন কেন্দ্রগুলোতে এখন এয়ার কুলিং বা সিলড লিকুইড লুপ ব্যবহার করা হচ্ছে, যা পানি বাষ্পীভূত না করে বারবার ব্যবহার করে। দক্ষতা বৃদ্ধি করা এখন ব্যবসায়িক দিক থেকেও লাভজনক। পরিশেষে, তিনি মনে করেন ডেটা সেন্টারগুলোর সামগ্রিক বিরোধিতা করার পরিবর্তে সেগুলোর নকশা, অবস্থান এবং পরিচালনার মান যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। স্বচ্ছ রিপোর্ট প্রদান এবং স্থানীয় উদ্বেগের সমাধানই পারে এই খাতের সাথে সাধারণ মানুষের সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে।