ছোটবেলা থেকে মূর্তা বা বেতি গাছের সঙ্গে পরিচিতি ছিল অপূর্ব কৃষ্ণ দে-র। টাঙ্গাইলের গ্রামের বাড়িতে শীতলপাটি তৈরি এবং এর কারিগরদের কাজ দেখে বড় হয়েছেন তিনি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শীতলপাটির ব্যবহার কমতে থাকায় সংকটে পড়েছেন কারিগররা। সেই সংকট থেকেই নতুন ভাবনার জন্ম—শীতলপাটিকে শুধু মাদুর হিসেবে নয়, বরং অন্য কোনো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে রূপ দেওয়া যায় কি না? এই চিন্তা থেকেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষার্থীর উদ্যোগ 'বুনন বাজার'-এর সূচনা।
ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স বিভাগের শিক্ষার্থী অপূর্ব কৃষ্ণ দে-র সঙ্গে এই উদ্যোগে যুক্ত হয়েছেন ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের আবির দে, মো. আশিক মিয়া এবং চৌধুরী খুবাইব বিন করিম। শুরুটা ছিল নিছক একটি ধারণা। পরে বিভিন্ন পিচিং ও প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তাঁরা নিজেদের আইডিয়াকে পরিণত করেছেন বাস্তব পণ্যে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্টারপ্রেনিউরশিপ ডেভেলপমেন্ট কোর্সের ব্যবহারিক অংশে 'বুনন বাজার' নিয়েই কাজ করেছেন তাঁরা। ক্রেতার চাহিদা, বাজারের সম্ভাবনা, প্রতিযোগিতা, ব্যবসায়িক মডেল, বিপণন, আর্থিক সম্ভাব্যতা ও ঝুঁকি—সবকিছু বিবেচনায় নিতে হয়েছে। চৌধুরী খুবাইব বিন করিমের মতে, একাডেমিক জার্নি শুধু আইডিয়া তৈরি করতেই সাহায্য করেনি; বরং সেই আইডিয়াকে কীভাবে সত্যিকার ব্যবসায় রূপ দেওয়া যায়, সে পথও দেখিয়েছে।
প্রতিযোগিতা থেকে পাওয়া মতামত ও পরামর্শ কাজে লাগিয়ে ধারণাটিকে আরও পরিণত করেছেন শিক্ষার্থীরা। দ্য আর্থ সোসাইটি ও নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের সহায়তায় 'গ্রিন ভয়েস মাস্টার বুটক্যাম্প' থেকে এক লাখ টাকার তহবিল পেয়ে শুরু হয় পণ্য তৈরির কাজ। তবে শীতলপাটিকে স্যান্ডেলে রূপ দেওয়া সহজ ছিল না। প্রথম দিকে বুনন, আকার, কাটিং, স্ট্র্যাপের অবস্থান এবং সোলের সঙ্গে পাটি যুক্ত করার পদ্ধতি নিয়ে নানা পরীক্ষা করতে হয়েছে। শীতলপাটির নিজস্ব টেক্সচার ও বুনন ঠিক রেখে পায়ের আকৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। খুবাইব জানান, প্রথম তৈরি স্যান্ডেলটিই চূড়ান্ত হয়নি; ব্যবহারিক পরীক্ষা ও ক্রেতাদের মতামতের ভিত্তিতে ধাপে ধাপে বদলে বর্তমান নকশায় পৌঁছেছেন তাঁরা।
এখন এই শীতলপাটির স্যান্ডেল বিক্রি হচ্ছে ৬৫০ টাকায়। বাজার যাচাইয়ের পাশাপাশি সাফল্য এসেছে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হাল্ট প্রাইজ প্রতিযোগিতায় প্রথম রানারআপ হয়েছে 'বুনন বাজার'। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্টারপ্রেনিউরশিপ ডেভেলপমেন্ট ক্লাবের একটি প্রতিযোগিতায় সেরা ৮-এ স্থান করে নিয়েছেন তাঁরা, যেখানে আকিজ রিসোর্সেসের পৃষ্ঠপোষকতায় চারজনই পেয়েছেন ইন্টার্নশিপের সুযোগ। সম্প্রতি বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ারেও তাঁদের উদ্যোগ প্রদর্শিত ও প্রশংসিত হয়েছে। এই যাত্রায় অর্থায়নের পাশাপাশি আর্থ সোসাইটির মেন্টরশিপ ও ব্যবসায়িক দিকনির্দেশনাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে জানান উদ্যোক্তারা।
পণ্যের মান বজায় রেখে উৎপাদন খরচ কমানো, মান বৃদ্ধি এবং ক্রেতার হাতে পণ্য পৌঁছে দেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। তবে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা শুধু স্যান্ডেলেই সীমাবদ্ধ নয়। ব্যাগ, ঘর সাজানোর উপকরণসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরির কথা ভাবছেন তাঁরা। আরও মানুষকে যুক্ত করে প্রশিক্ষিত কারিগরদের দল গঠন এবং ক্লাস্টারভিত্তিক উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনাও আছে। চৌধুরী খুবাইব বিন করিমের ভাষায়, 'আমাদের স্বপ্ন ঐতিহ্যকে শুধু সংরক্ষণ করা নয়, বরং একে নতুনভাবে বাঁচিয়ে রাখা।'



