কাঁচা আম বা বাতাবি লেবুতে সামান্য লবণ ছিটিয়ে খেলে যে স্বাদে পরিবর্তন আসে, তা অনেকের কাছেই পরিচিত অভিজ্ঞতা। লবণের সংস্পর্শে এসে টক জাতীয় ফলে আপাতদৃষ্টিতে মিষ্টি ভাব ফুটে ওঠে বলে আমরা ধারণা করি। কিন্তু এই রহস্যের পেছনে আসলে কাজ করছে আমাদের জিভের গঠনগত জটিলতা, যেখানে লবণের উপাদানগুলো একটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় মিষ্টির অনুভূতি সক্রিয় করে তোলে।

জিভের পৃষ্ঠে অবস্থিত অসংখ্য স্বাদকোরকে রয়েছে বিশেষায়িত রিসেপ্টর কোষ। খাবারের অণুগুলো যখন এই রিসেপ্টরের সংস্পর্শে আসে, তখন মস্তিষ্কে বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠানো হয় — আর সেই সংকেতের মাধ্যমেই আমরা মিষ্টি, নোনতা, টক, তেতো বা উমামি স্বাদ আলাদা করতে পারি। সাধারণত প্রতিটি স্বাদের জন্য আলাদা রিসেপ্টর দায়িত্ব পালন করে থাকে, তবে মিষ্টি স্বাদের প্রক্রিয়াটি বিজ্ঞানীদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে।

গবেষণার শুরুতে বিজ্ঞানীরা ধরে নিয়েছিলেন, মিষ্টি শনাক্তের জন্য একটি মাত্র প্রধান রিসেপ্টর যথেষ্ট। এই ধারণা যাচাই করতে তারা ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা চালান। পরীক্ষায় ইঁদুরের প্রধান মিষ্টি রিসেপ্টর তৈরির জিনটি বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছিল — ফলে তাদের আর মিষ্টি স্বাদ পাওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু বিস্ময়করভাবে, চিনির মাত্রা বেশি থাকা খাবারগুলো ইঁদুরেরা আগের মতোই আগ্রহ নিয়ে খেতে থাকে। এই ফলাফল বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তোলে — জিভে কি মিষ্টি চেনার অন্য কোনো পথ রয়েছে?

২০২০ সালে 'অ্যাক্টা ফিজিওলজিকা' সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়। গবেষকরা আবিষ্কার করেন, আমাদের মিষ্টি চেনার রিসেপ্টর কোষে 'এসজিএলটি-১' নামে একটি প্রোটিন অবস্থান করে। এই প্রোটিন কিডনি ও নাড়িতে সোডিয়ামের সাহায্যে কোষের ভেতরে গ্লুকোজ প্রবেশে সহায়তা করে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, ইঁদুরের জিভের স্বাদকোরকেও একই প্রক্রিয়া কার্যকর। যেসব ইঁদুরের প্রধান মিষ্টি রিসেপ্টর ছিল না, তাদের শুধু চিনি দেওয়ার চেয়ে চিনির সাথে সামান্য লবণ মিশিয়ে দিলে স্নায়ুগুলো অনেক দ্রুত মস্তিষ্কে সংকেত পাঠাতে শুরু করে।

মানুষ ও ইঁদুরের শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় অনেক মিল থাকায় গবেষকদের ধারণা, মানুষের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে থাকে। এ কারণেই পুডিং বা ক্যারামেলে এক চিমটি লবণ যোগ করলে মিষ্টির মাত্রা যেন আরও বেড়ে যায় বলে মনে হয়। তবে লবণের এই মিষ্টি বর্ধন ক্ষমতার পেছনে শুধু সোডিয়ামই দায়ী নয় — ক্লোরাইড আয়নেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

গবেষণা দলটি পরবর্তী পর্যায়ে পর্যবেক্ষণ করে দেখেছে, ক্লোরাইড আয়নগুলো মিষ্টির রিসেপ্টরের সাথে যুক্ত হয়ে এর গঠন পরিবর্তন করে দেয়। আকৃতিতে এই পরিবর্তন ঘটলেই রিসেপ্টরটি সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং মস্তিষ্কে মিষ্টি স্বাদের বার্তা প্রেরণ করে। পরীক্ষায় ইঁদুরদের সামান্য ক্লোরাইডযুক্ত মিষ্টি দ্রবণ দেওয়ার পর তাদের স্নায়ুকোষের কার্যক্রম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়। কিন্তু কোনো ওষুধ দিয়ে এই প্রক্রিয়া বন্ধ করে দিলে সেই অতিরিক্ত মিষ্টি ভাব আর দেখা যায় না।

গবেষকদের মতে, এই পরীক্ষাগুলো থেকে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে অল্প পরিমাণ লবণ শেষ পর্যন্ত খাবারের মিষ্টি ভাবকে আরও তীব্র করে তুলতে সক্ষম। তবে মানুষের জিভের স্বাদকোরকে ঠিক একই পদ্ধতিতে এই প্রক্রিয়া ঘটে কি না — তা সম্পূর্ণ নিশ্চিত হতে হলে আরও বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন। বিজ্ঞানীরা এখন সেই পথেই এগোচ্ছেন।