সাতক্ষীরার তালা উপজেলার মাঝিয়াড়া গ্রামে এক সময়কার বিলুপ্তপ্রায় মৃৎশিল্প এখন আধুনিকতার ছোঁয়ায় নতুন রূপ লাভ করেছে। ঐতিহ্যগতভাবে পাল সম্প্রদায়ের প্রধান পেশা হওয়া সত্ত্বেও সময়ের সাথে তাল মেলাতে না পারা এবং স্বল্পমূল্যের কারণে এই শিল্পটি প্রায় হারিয়ে গিয়েছিল। তবে বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত মানের ছাঁচ ব্যবহারের ফলে এই শিল্পে পুনরায় আগ্রহী হয়ে উঠছেন কারিগররা।
উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান 'উন্নয়ন প্রচেষ্টা'-র কারিগরি সহযোগিতায় বর্তমানে এখানে থালা, বাটি, মগ, কাপ-পিরিচ, জগ, বোতল, ফুলদানি এবং টেরাকোটাসহ বিভিন্ন ধরনের নান্দনিক মাটির সামগ্রী তৈরি হচ্ছে। কারখানার ভেতরে এখন ব্যবহৃত হচ্ছে 'জিগার মেশিন' নামক বিশেষ যন্ত্র, যা মাটির পণ্যের আকৃতি প্রদানে সহায়তা করে। কারুশিল্পী কামরুল ইসলামের মতে, এই যন্ত্রের সাহায্যে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পণ্যের গঠন তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।
উৎপাদন প্রক্রিয়ায় প্রথমে খালবিল থেকে সংগৃহীত মাটি মেশিনে ছেঁকে ছোট ছোট দলায় রূপান্তর করা হয়। এরপর নির্দিষ্ট ছাঁচে বসিয়ে জিগার মেশিনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আকার দেওয়া হয়। পণ্যগুলো শুকানোর পর তার ওপর রঙের প্রলেপ দেওয়া হয়। নারী শ্রমিক অর্চনা পাল জানান, রঙের মিশ্রণে খয়ের, সোডা, রংমাটি ও পানি ব্যবহার করা হয়। সবশেষে মাটি ও ইট দিয়ে তৈরি বড় চুল্লিতে ৯ থেকে ১২ ঘণ্টা ধরে পণ্যগুলো পোড়ানো হয়। এই প্রক্রিয়ায় প্রাথমিক আগুন জ্বালানোকে কারিগররা 'তাওনা' বলে অভিহিত করেন।
মৃৎশিল্পী নমিতা ও ললিতা পালের অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, আগে হাত-পা দিয়ে মাটি প্রস্তুত করতে অনেক পরিশ্রম হতো, কিন্তু এখন মেশিনের কল্যাণে সময় কম লাগছে এবং পণ্যের ফিনিশিং অনেক উন্নত হয়েছে। ললিতা পাল তার পূর্বপুরুষদের হারিয়ে যাওয়া এই পেশায় পুনরায় ফিরে পেয়ে আনন্দিত। স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কাশেম সরদারও মাটির পণ্য তৈরিতে যন্ত্রের ব্যবহার দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
এই প্রকল্পের সার্বিক ব্যবস্থাপনা পরিচালক চন্দ্র শেখর দাশ জানান, আধুনিক বাজারজাতকরণ কৌশলের অভাবে এই শিল্পটি হুমকির মুখে ছিল। তবে এখন উন্নত মানের পণ্য তৈরি হওয়ায় দেশীয় বাজারের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। অনেক সময় অর্ডারের তুলনায় উৎপাদন কম হওয়ায় সরবরাহ করতে বেগ পেতে হচ্ছে।
উন্নয়ন প্রচেষ্টার পরিচালক শেখ ইয়াকুব আলী জানান, ২০২১ সালে বিশ্বব্যাংকের একটি প্রকল্পের সহায়তায় সাতক্ষীরা, খুলনা ও যশোরের প্রায় ৬০০ পাল শিল্পীকে সংগঠিত করে প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয়। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এবং এখন পাল সম্প্রদায়ের বাইরে অন্যান্য মানুষও এই পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। শ্রমিকদের মজুরি দেওয়া হচ্ছে পণ্য বিক্রির লভ্যাংশ থেকে।
সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ এই উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, হারিয়ে যেতে বসা এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। এই সৃজনশীল শিল্পকে আরও এগিয়ে নিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।




