বিশ্বজুড়ে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় গত দুই বছর দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা খাতের কোম্পানিগুলো অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছিল। বিশেষ করে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ফলে ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় সাশ্রয়ী মূল্যে দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করে ট্যাংক, আর্টিলারি এবং মিসাইল সিস্টেম রপ্তানিতে দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পায়। তবে বর্তমান সময়ে এই প্রবৃদ্ধির ধারায় বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা গেছে। সিএনবিসি-র এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বছর দেশটির শীর্ষস্থানীয় প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর শেয়ার বাজারে ব্যাপক দরপতন ঘটেছে।
এসবিএস-এর দেওয়া তথ্যমতে, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান চারটি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান—হানহওয়া অ্যারোস্পেস, এলআইজি ডিএন্ডএ, হুন্দাই রোটেম এবং কোরিয়া অ্যারোস্পেস-এর সম্মিলিত বাজারমূল্য এক বছরের সর্বোচ্চ ১৭০ ট্রিলিয়ন ওন থেকে কমে অক্টোবরের শেষ নাগাদ প্রায় ৬২ ট্রিলিয়ন ওন বা ৪ হাজার ৬১৮ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক যুদ্ধের ধরন বদলে যাওয়া এই পতনের অন্যতম প্রধান কারণ। ইউক্রেন এবং ইরানের সংঘাত প্রমাণ করেছে যে, কোটি কোটি ডলারের ব্যয়বহুল ট্যাংক বা আর্টিলারি সিস্টেমের চেয়ে সাশ্রয়ী ড্রোন এবং কাউন্টার-ড্রোন সিস্টেম অনেক বেশি কার্যকর। ইরানের ড্রোন হামলার ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের আকাশ প্রতিরক্ষা মিসাইলের মজুত দ্রুত হ্রাস পাওয়ায় এখন ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দিকেই বিশ্ববাজারের ঝোঁক বেড়েছে।
কেবি সিকিউরিটিজ-এর সিনিয়র ম্যানেজিং ডিরেক্টর পিটার কিম মনে করেন, প্রচলিত সাঁজোয়া যান বা কামানের চেয়ে ভিন্ন উপায়ে এখন যুদ্ধ লড়া হচ্ছে, যেখানে কোরিয়ান কোম্পানিগুলো পিছিয়ে আছে। পাশাপাশি ড্রোন বাজারে চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও এশিয়ার অন্যান্য প্রতিযোগীদের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ব্যাংক অফ আমেরিকার অ্যানালিস্ট কে জে হুয়াং-এর মতে, অস্ত্র সংগ্রহের অগ্রাধিকার এখন ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দিকে পরিবর্তিত হয়েছে। তবে শেয়ার দরপতনের পেছনে কেবল প্রযুক্তির পরিবর্তন নয়, বরং বিনিয়োগকারীদের মুনাফা কমার আশঙ্কা, মুদ্রার শক্তিশালী অবস্থান এবং রপ্তানি আদেশ পেতে বিলম্বের মতো বিষয়গুলোও দায়ী। এছাড়া সেমিকন্ডাক্টর খাতের অতি-মূল্যায়ন এবং সরকারি বাজেটের অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা এই চাপ আরও বাড়িয়েছে।
আর্থিক ফলাফলেও এই প্রভাব স্পষ্ট। হানহওয়া অ্যারোস্পেস-এর তৃতীয় প্রান্তিকের পরিচালন মুনাফা গত বছরের তুলনায় ৪৬ শতাংশেরও বেশি কমেছে এবং শেয়ারের দাম কমেছে ২৮ শতাংশের বেশি। হুন্দাই রোটেম-এর মুনাফা ১১.১ শতাংশ হ্রাসের পাশাপাশি শেয়ারের দাম প্রায় ৬০ শতাংশ কমেছে। তবে কোরিয়া অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ কিছুটা ব্যতিক্রম; তাদের বিক্রি ৫২ শতাংশ এবং মুনাফা ৩২ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় শেয়ারের পতন মাত্র ৮ শতাংশের কাছাকাছি সীমাবদ্ধ রয়েছে।
এত চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও দীর্ঘমেয়াদী সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী বিশেষজ্ঞরা। ব্যাংক অফ আমেরিকার হুয়াং জানান, পশ্চিম ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের সাথে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় কোরিয়ার সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া কে৯ হাওইটজারের মতো প্রচলিত অস্ত্রের চাহিদাই প্রমাণ করে যে এই প্ল্যাটফর্মগুলোর গুরুত্ব এখনো শেষ হয়ে যায়নি। সম্প্রতি স্পেন এবং নরওয়ের সাথে বড় অংকের চুক্তি এবং মালয়েশিয়ার কাছে এলআইজি ডিএন্ডএ-র প্রথম আন্তর্জাতিক মিসাইল সিস্টেম 'কে-এসএএএম' রপ্তানি এই আশাকে আরও জোরালো করেছে।
কোয়ান্টাম স্ট্র্যাটেজির ডেভিড রোচ মনে করেন, যদিও ড্রোন ও এআই প্রযুক্তির গুরুত্ব বাড়ছে, কিন্তু কোনো ভূখণ্ড দখল করতে হলে পদাতিক বাহিনী, ট্যাংক ও সাঁজোয়া যানের বিকল্প নেই। দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানিগুলো বর্তমানে চালকহীন ব্যবস্থা ও ড্রোন প্রযুক্তিতে সক্রিয়ভাবে বিনিয়োগ করছে। যদিও বৈশ্বিক বাজারে এদের অপারেশনাল ট্র্যাক রেকর্ড এখনও গড়ে ওঠেনি, তবে ভবিষ্যতে এর ইতিবাচক ফলাফল আসবে বলে বিশ্বাস করেন পিটার কিম।




