যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক আদালতে চলমান ৯/১১ হামলার ভুক্তভোগীদের পরিবারের মামলায় নতুন মোড় এসেছে। সৌদি সরকারের বিরুদ্ধে এক ট্রিলিয়ন ডলারের মামলায় অভিযুক্ত ওমর আল-বায়ুমির বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য দিলেন সান ডিয়াগোর পার্কউড অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের প্রাক্তন ব্যবস্থাপক হলি র্যাচফোর্ড। দীর্ঘ ২৫ বছর নীরব থাকার পর বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, বায়ুমি তার কাছে আসা দুই যুবককে অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিতে সহায়তা করেছিলেন এবং তাদের সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ওই দুই যুবকই পরবর্তীতে ৯/১১ হামলার হিজ্যাকার হিসেবে পরিচিত নাওয়াফ আল-হাজমি ও খালিদ আল-মিহদার।
১৯৯৯ সালের সেপ্টেম্বরে বায়ুমি তার পরিবার নিয়ে পার্কউড অ্যাপার্টমেন্টে উঠে আসেন। র্যাচফোর্ডের স্মৃতিচারণে তিনি ছিলেন সবসময় হাস্যোজ্জ্বল ও বন্ধুত্বপূর্ণ একজন মানুষ। তার পুল পার্টিতে নিয়মিত অংশ নিতেন তিনি। কয়েক মাস পর বায়ুমি র্যাচফোর্ডের সাথে দুই 'ভদ্র' যুবকের পরিচয় করিয়ে দেন, যারা তার প্রতিবেশীও হয়ে ওঠে। ওই দুই যুবকই পরে আমেরিকান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৭৭ ছিনতাই করে পেন্টাগনে আছড়ে ফেলে।
বিবিসি রেডিও ৪-এর পডকাস্ট 'ইনট্রিগ: এ ৯/১১ স্টোরি' এবং আসন্ন প্যানোরামা ডকুমেন্টারিতে র্যাচফোর্ডের সাক্ষাৎকার প্রচারিত হবে। এই সাক্ষাৎকারে তিনি বায়ুমির সেই সংস্করণকে চ্যালেঞ্জ করেছেন, যা তিনি পুলিশ, এফবিআই এবং নিউ ইয়র্ক আদালতে দিয়েছিলেন। র্যাচফোর্ড জানান, ২০০০ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি বায়ুমি ওই দুই যুবককে তার অফিসে নিয়ে আসেন এবং তাদের ভাড়ার যোগ্যতা নিয়ে আলোচনা করেন। তারা কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা আয়ের উৎস দেখাতে পারেনি, তবে কয়েক হাজার ডলার নগদ ছিল। পরের দিন বায়ুমি তাদের ব্যাংকে নিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলতে সহায়তা করেন এবং তৃতীয় দিনে তিনি নিজে তাদের লিজে স্বাক্ষর করেন — তাদের আইনি গ্যারান্টর হয়ে দাঁড়ান।
হাজমি ও মিহদার ১৫০ নম্বর অ্যাপার্টমেন্টে ওঠে, যা বায়ুমির বাড়ির কয়েক দরজা দূরে। র্যাচফোর্ড বলেন, পরবর্তী কয়েক মাসে তিনি ওই দুই যুবককে বারবার দেখেছেন, এমনকি তাদের সাথে চা ও কুকিজও খেয়েছেন। বায়ুমি তাদের সাথে ঘনিষ্ঠ ছিলেন, যদিও তিনি দাবি করেছিলেন যে তাদের অ্যাপার্টমেন্ট দেওয়ার পর তিনি তাদের এড়িয়ে চলতেন। র্যাচফোর্ড বলেন, 'তিনি বলেছিলেন যে তিনি তাদের দেখেননি, কিন্তু এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। তারা একসাথে আমার অফিসে আসত, এবং আমি নিজে দেখেছি তারা কতটা বন্ধুত্বপূর্ণ।' এছাড়া হিজ্যাকাররা ভাড়া দিতে ব্যর্থ হলে বায়ুমি নিজেই সেই টাকা পরিশোধ করতেন বলেও তিনি জানান।
৯/১১ হামলার পর র্যাচফোর্ডকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এফবিআই। তিনি বায়ুমির গ্যারান্টর ফর্মটি হস্তান্তর করেন, যা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এফবিআই জানতে পারে, বায়ুমি সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে যুক্ত দুটি কোম্পানি থেকে বছরে প্রায় ৯০ হাজার ডলার বেতন পেতেন, কিন্তু কখনো কাজে যেতেন না। তার বেতন হিজ্যাকারদের সান ডিয়াগোতে আসার পর দ্বিগুণ হয়ে যায় এবং তারা চলে যাওয়ার পর কমে যায়। এফবিআই আরও পায় আল-কায়েদার সাথে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত সৌদি সরকার-সমর্থিত একটি দাতব্য সংস্থায় চিঠি এবং বায়ুমির নিজের লেখা কিছু নথি, যা 'জিহাদি' হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।
২০০১ সালের সেপ্টেম্বরে বায়ুমিকে বার্মিংহামে গ্রেপ্তার করে মেট্রোপলিটন পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি প্রথমে কোনো হিজ্যাকারকে চিনতে অস্বীকার করেন, পরে বলেন নাওয়াফ ও খালিদ নামে দুইজনকে সাহায্য করেছিলেন। তবে তিনি দাবি করেন, লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি রেস্তোরাঁয় তাদের সাথে তার পরিচয় হয় এবং তারা সান ডিয়াগোতে এসে বাসা খোঁজার কথা বললে তিনি শুধু তাদের অ্যাপার্টমেন্ট দেখিয়ে দিয়েছিলেন। তার এই বক্তব্য র্যাচফোর্ডের সাক্ষ্যের সাথে সাংঘর্ষিক। সাত দিন আটক থাকার পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করা হয়নি। পরে ২০০২ সালে তিনি সৌদি আরবে চলে যান।
২০০৪ সালে ৯/১১ কমিশন বায়ুমিকে 'অবিশ্বাস্য' এবং 'উদার' হিসেবে চিহ্নিত করে তাকে কার্যত নির্দোষ ঘোষণা করে। তবে নিউ ইয়র্কের বিচারক জর্জ ড্যানিয়েলস গত বছর রায় দেন যে, প্রমাণ থেকে 'যুক্তিসঙ্গত অনুমান' করা যায় যে বায়ুমি সৌদি সরকারের সাথে সমন্বয় করে হিজ্যাকারদের সহায়তা করেছিলেন। সৌদি আরব এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে এবং মামলাটি এখন আপিল আদালতে। অক্টোবরে মৌখিক শুনানি হবে। সৌদি সরকার সবসময় অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে এবং বলছে, তাদের উপর সার্বভৌম অনাক্রম্যতা প্রযোজ্য।
র্যাচফোর্ড জানান, ৯/১১ তার জীবনকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। তিনি পার্কউড ছেড়ে প্রথমে সৈকতে, তারপর একটি রিজার্ভেশনে এবং অবশেষে মরুভূমির নির্জন এলাকায় চলে যান। তিনি বলেছেন, '৯/১১ আমাকে মানুষের প্রতি আস্থা হারাতে শিখিয়েছে। আমি এখন শুধু সেই মানুষদের সাথে মিশি যাদের আমি পুরোপুরি বিশ্বাস করি।' তবে তিনি এখনও প্রশ্ন করেন, 'আমি কি আরও কঠোর হলে কিছু করতে পারতাম?' এই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, 'আমি মনে করি বায়ুমি যা বলেছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি জানি না সে কীভাবে রক্ষা পেয়েছে।'




