২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সকালে আল-কায়েদার ১৯ জন ছিনতাইকারী চারটি বাণিজ্যিক বিমান নিয়ন্ত্রণ করে এক ভয়াবহ হামলা চালায়। এর ফলে ম্যানহাটনের লোয়ার অংশে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ার এবং ওয়াশিংটনের পেন্টাগন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চতুর্থ বিমানটি পেনসিলভানিয়ার শ্যাঙ্কসভিলের একটি মাঠে বিধ্বস্ত হয়। এই নারকীয় তাণ্ডবে প্রায় ৩,০০০ মানুষ প্রাণ হারান, যার অধিকাংশেরই মৃত্যু ঘটে নিউ ইয়র্কের ওই দুই টাওয়ার ধসে পড়ার ফলে। এই ঘটনা মার্কিন জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন আনে, যার প্রভাব বিমানবন্দর নিরাপত্তা থেকে শুরু করে নতুন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ গঠন এবং দুটি দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে পরিলক্ষিত হয়।

২৫ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও অনেকে মনে করেন কীভাবে ছোট ছোট কিছু কারণ তাদের জীবন বাঁচিয়েছিল। বর্তমান বাণিজ্য সচিব হাওয়ার্ড লুটনিক তখন ক্যান্টর ফিটজাল্ডের সিইও ছিলেন এবং উত্তর টাওয়ারের ১০৫তম তলায় তার অফিস ছিল। সাধারণত তিনি ভোর ৬টার মধ্যেই সেখানে পৌঁছে যেতেন, কিন্তু সেদিন তার স্ত্রী তাকে তাদের ছেলেকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার অনুরোধ করেন। সেটি ছিল তার ছেলে কাইলের কিন্ডারগার্টেনের প্রথম দিন। ফলে তিনি অফিসে যাননি। তবে ওইদিন তার ভাই গ্যারি যথারীতি কাজে গিয়েছিলেন এবং ক্যান্টর ফিটজাল্ডের ৬৫৮ জন মৃত কর্মীর একজন হিসেবে তিনি প্রাণ হারান।

একইভাবে টুইন টাওয়ারের ৯৯ বছরের লিজ চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী ল্যারি সিলভারস্টাইন প্রতিদিন উত্তর টাওয়ারের ১০৬তম তলার 'উইন্ডোজ অন দ্য ওয়ার্ল্ড' রেস্তোরাঁয় প্রাতঃরাশ করতেন। তবে ১১ সেপ্টেম্বরের সকালে তার স্ত্রী তাকে একজন ত্বক বিশেষজ্ঞের অ্যাপয়েন্টমেন্ট ঠিক করে দিয়েছিলেন, যে কারণে তিনি রেস্তোরাঁয় যাননি। তার দীর্ঘদিনের সহকারী জিওফ্রে হোয়ার্টনও সকাল ৮টা ৪৪ মিনিটে লিফটে করে নিচে নেমে আসেন, ঠিক যার দুই মিনিট পরেই বিমানটি আঘাত হানে। ওই রেস্তোরাঁয় উপস্থিত অন্য কেউ বেঁচে ফেরেননি। রেস্তোরাঁর এক্সিকিউটিভ শেফ মাইকেল লোমোনাকো কেবল তার চশমা ঠিক করতে নিচে একটি দোকানে গিয়েছিলেন বলে প্রাণে বেঁচে যান, যদিও তার রান্নাঘরের ৩০ জনেরও বেশি কর্মী মারা যান।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের আত্মীয় এবং অয়ন কর্পোরেশনের ম্যানেজিং ডিরেক্টর জিম পিয়ার্স দক্ষিণ টাওয়ারের উপরের তলায় একটি মিটিংয়ের কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় শেষ মুহূর্তে মিটিংটি পাশের অন্য একটি ভবনে স্থানান্তর করা হয়। এই পরিবর্তনের কথা জানতে না পেরে ওই দলের ১১ জন সদস্য প্রাণ হারান। পিয়ার্স পাশের ভবন থেকেই দ্বিতীয় বিমানটির আঘাত এবং ধ্বংসযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করেন।

অন্যদিকে, ২০০২ সালের শীতকালীন অলিম্পিকের সংগঠক কমিটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মিট রমনি ব্যাটারি পার্কের কাছে একটি সংবাদ সম্মেলনের পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে কংগ্রেসের সাথে অলিম্পিক নিরাপত্তা অর্থ নিয়ে বিরোধের কারণে তাকে ওয়াশিংটনেই থাকতে হয়, যার ফলে তিনি নিউ ইয়র্কের ওই মৃত্যুর মুখে পড়েননি। ইয়র্কের ডাচেস সারাহ ফার্গুসনের একটি দাতব্য সংস্থা উত্তর টাওয়ারের ১০১তম তলায় ছিল, কিন্তু একটি ইন্টারভিউ দীর্ঘায়িত হওয়ায় তিনি যথাসময়ে সেখানে পৌঁছাতে পারেননি। স্যান্ডলার ও'নিল অ্যান্ড পার্টনার্স-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা জিমি ডান দক্ষিণ টাওয়ারের ১০৪তম তলায় কর্মীদের সাথে থাকার কথা থাকলেও তিনি একটি গল্ফ চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য ৫০ মাইল দূরে অবস্থান করছিলেন। তার প্রতিষ্ঠানের ১৭১ জনের মধ্যে ৬৬ জন প্রাণ হারান।

এমনকি বিনোদন জগতের কিছু তারকাও অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছিলেন। অভিনেতা মার্ক ওয়ালবার্গ প্রথম বিমানটির (ফ্লাইট ১১) টিকিট বুক করলেও টরন্টো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে যাওয়ার জন্য এক সপ্তাহ আগেই তা বাতিল করেন। অন্যদিকে সেথ ম্যাকফর্লেন ভুল প্রস্থান সময়ের কারণে ওই একই ফ্লাইটটি কয়েক মিনিট মিস করেন। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, সামান্য কিছু সময়ের ব্যবধান বা দৈনন্দিন ছোট সিদ্ধান্ত কীভাবে জীবন ও মৃত্যুর পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।