বসনিয়ার যুদ্ধের অন্যতম কুখ্যাত ব্যক্তিত্ব এবং 'বসনিয়ার কসাই' হিসেবে পরিচিত জেনারেল রাতকো ম্লাদিচ ৮৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছেন। নব্বইয়ের দশকে যুগোস্লাভিয়ার ভাঙনের সময় বসনিয়ান সার্ব সেনাবাহিনীর কমান্ডার হিসেবে তিনি এক নৃশংস 'জাতিগত নির্মূল' বা এথনিক ক্লিনজিং অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তার লক্ষ্য ছিল একটি 'বৃহত্তর সার্বিয়া' গঠন করা, যা বাস্তবায়নে তিনি নারী, পুরুষ ও শিশুদের নির্বিচারে হত্যার পথ বেছে নেন। হিটলারের তৃতীয় রাইখের পর ইউরোপের ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী অপরাধের জন্য তিনি দায়ী ছিলেন।

ম্লাদিচের চরম উগ্র জাতীয়তাবাদ তাকে তার অনুসারীদের কাছে নায়ক করে তুললেও, মুসলিম বসনিয়ানদের জন্য তিনি ছিলেন এক আতঙ্কের নাম। তিনি সারাজেভো শহরের দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী অবরোধের নেতৃত্ব দেন, যেখানে প্রতিদিন শেল এবং স্নাইপারের গুলিতে অসংখ্য নাগরিক প্রাণ হারাতেন। আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে দীর্ঘতম এই অবরোধটি স্থায়ী হয়েছিল ১,৪২৫ দিন। এই সময়ের মধ্যে প্রায় ১৩ হাজার মানুষ নিহত হয় এবং শহরের প্রায় প্রতিটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ম্লাদিচের অপরাধের মধ্যে সবচেয়ে জঘন্য ছিল স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যা। জাতিসংঘের ঘোষিত 'নিরাপদ এলাকা' হওয়া সত্ত্বেও তার বাহিনী সেখানে প্রবেশ করে। শুরুতে শিশুদের মিষ্টি বিতরণ করে এবং সবাইকে নিরাপদ থাকার আশ্বাস দিয়ে তিনি বিশ্ববাসীকে বিভ্রান্ত করলেও, পরবর্তীতে ৮ হাজার পুরুষ ও কিশোরকে ধরে নিয়ে গিয়ে গণকবরstানে পুঁতে ফেলা হয়। এই ঘটনাটি ইউরোপের ইতিহাসে এবং জাতিসংঘের জন্য এক চরম লজ্জাজনক মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

ম্লাদিচের ব্যক্তিগত জীবনও ছিল ট্র্যাজেডির। তার ২৩ বছর বয়সী কন্যা আনা একজন মানবাধিকার কর্মীর প্রেমে পড়েছিলেন। বাবার নৃশংসতার সাথে নিজের আদর্শের সংঘাতের মুখে এবং প্রেমিকের চরম শর্তের পর আনা আত্মহত্যা করেন। তবে ম্লাদিচ এই ট্র্যাজেডির জন্য নিজেকে দায়ী করার বদলে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র তত্ত্বের আশ্রয় নিয়েছিলেন।

যুদ্ধের পর দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে তিনি পালিয়ে বেড়ান এবং সার্বিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট স্লোবোদান মিলোশেভিচের সুরক্ষায় বিলাসিতায় জীবন কাটাতেন। শেষ পর্যন্ত ২০০৮ সালে তার সহযোগী রাদোভান কারাদজিকের গ্রেপ্তারের পর তাকেও একটি খামারে খুঁজে পাওয়া যায়। হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ৫০০ দিনের বিচার প্রক্রিয়ার পর তাকে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধবিধির গুরুতর লঙ্ঘনের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

আদালতে তার আচরণ ছিল ঔদ্ধত্যপূর্ণ। এমনকি ভিকটিমদের আত্মীয়দের দিকে তাকিয়ে তিনি বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে উপহাস করেছিলেন। তার মতে, 'সীমানা রক্ত দিয়ে আঁকা হয় এবং রাষ্ট্র চিহ্নিত হয় কবরের মাধ্যমে'। ২০২৪ সালে তার অসুস্থতার কারণে সার্বিয়ায় ফিরে গিয়ে সাজ খাটানোর আবেদন আদালত নাকচ করে দিয়েছিল।

ম্লাদিচের মৃত্যুতে বসনিয়া ও সার্বিয়ার মাঝে দীর্ঘদিনের চাপা উত্তেজনা আবারও সামনে চলে এসেছে। অনেক সার্বিয়ান তাকে তাদের সংস্কৃতির রক্ষাকর্তা মনে করলেও, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং বসনিয়ান মুসলিমদের কাছে তিনি থাকবেন একজন খুনি দস্যু হিসেবে, যিনি ইউরোপের ইতিহাসে কলঙ্কিত এক অধ্যায় তৈরি করেছেন।