মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য, যা পূর্বে আরাকান নামে পরিচিত ছিল, বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি সীমান্তবর্তী অঞ্চল নয়—ইতিহাস, জনগোষ্ঠী, বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতির নানা সূত্রে এটি বাংলাদেশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। গত দুই দশকে এ অঞ্চলে এত বড় পরিবর্তন ঘটেছে যে ২০০৮ সালে যে রাখাইন দেখা গিয়েছিল, ২০২৬ সালে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন ভূখণ্ড বলে মনে হচ্ছে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) মো. বায়েজিদ সরোয়ার তার সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে এ কথা বলেছেন। তিনি ২০০৮ সালে বাংলাদেশ রাইফেলসের (বর্তমান বিজিবি) ৪২ রাইফেল ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক হিসেবে কক্সবাজারের টেকনাফে দায়িত্ব পালন করেন এবং দায়িত্বের প্রয়োজনে চারবার মংডু ও তুমব্রু এলাকায় যাওয়ার সুযোগ পান।

সে সময় মংডু ছিল নাফ নদীর ওপারে সবুজ পাহাড়, বিস্তীর্ণ ধানখেত, ছোট ছোট গ্রাম এবং ধীরগতির একটি সীমান্ত শহর। বাইরে থেকে সবকিছু শান্ত মনে হলেও জাতিগত বৈষম্য, রাজনৈতিক বঞ্চনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার আভাস ছিল। পরে ২০১২ সালের সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নৃশংস অভিযান ও বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গার বাংলাদেশে পালিয়ে আসা, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থান এবং ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার বাহিনীর নতুন সংঘাত—সব মিলিয়ে রাখাইনের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি আমূল বদলে গেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আরাকান আর্মি মংডু দখল করে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের মূল্যায়ন অনুযায়ী, তারা রাখাইনের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে।

সরোয়ার তার লেখায় উল্লেখ করেছেন, ২০০৮ সালে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও পতাকা বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল। ২০০৮ সালের ২ জুন প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক পতাকা বৈঠকে অংশ নিতে তিনি মংডু যান। তখন মিয়ানমারের তৎকালীন সীমান্তরক্ষী বাহিনী নাসাকার কর্মকর্তারা সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে তাদের অভ্যর্থনা জানান এবং ঘূর্ণিঝড় নার্গিসে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বাংলাদেশ রাইফেলসের পাঠানো ত্রাণসামগ্রীর জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তবে আজকের সীমান্ত পরিস্থিতির সঙ্গে সেই সময়ের তুলনা করলে স্পষ্ট হয়—সীমান্তের চরিত্র কখনো স্থায়ী নয়; রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, সামরিক শক্তির ভারসাম্য এবং পারস্পরিক আস্থা বদলে গেলে সীমান্তের বাস্তবতাও দ্রুত বদলে যায়।

মংডুতে গিয়ে তার প্রথম অনুভূতি ছিল পরিচিতির—গাছপালা, আবহাওয়া, পোশাক, খাবার এবং অনেক সামাজিক রীতির সঙ্গে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মিল ছিল। রোহিঙ্গা ভাষার সঙ্গে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্য তাকে আকৃষ্ট করেছিল। তবে একটি বৈপরীত্যও চোখে পড়েছিল—রোহিঙ্গারা ব্যবসা-বাণিজ্যে অত্যন্ত সক্রিয় হলেও প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান ছিল দুর্বল। বাইরে থেকে সহাবস্থানের চিত্র দেখা গেলেও তাদের মধ্যে চাপ, বঞ্চনা ও অনিশ্চয়তার অনুভূতি ছিল। তিনি মনে করেন, নাগরিকত্ব, পরিচয়, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও অধিকারসংক্রান্ত প্রশ্ন দীর্ঘদিন অমীমাংসিত থাকলে সংঘাতের উপাদান ভেতরে ভেতরে জমতে থাকে।

একটি স্মৃতি উল্লেখ করেছেন তিনি—২০০৮ সালে মংডুর বাজারে কয়েকজন রোহিঙ্গা ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা হয়েছিল, যাদের একজন ছিলেন বেশ সচ্ছল। বহু বছর পর ২০১৭ সালে কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গিয়ে ঘটনাক্রমে সেই ব্যবসায়ীর সঙ্গে আবার দেখা হয়। তিনি তখন পরিবার নিয়ে জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে এসেছেন, একটি ছোট পলিথিনের ঘরে নিঃস্ব অবস্থায়। সরোয়ার মনে করেন, এই একজন মানুষের জীবনই রাখাইনের পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক—প্রতিটি পরিসংখ্যানের পেছনে থাকে একটি পরিবার, একটি বাড়ি, একটি পেশা ও হারিয়ে যাওয়া একটি জীবন।

তুমব্রু এলাকার কৌশলগত গুরুত্বও তুলে ধরেছেন তিনি। বাংলাদেশ-মিয়ানমারের ২৭১ কিলোমিটার সীমান্তের বড় অংশ পাহাড়, বন বা নাফ নদী দিয়ে গঠিত, কিন্তু ঘুমধুম-তুমব্রু অঞ্চল তুলনামূলকভাবে সমতল ও সড়কপথে চলাচলের উপযোগী। ২০০৮ সালে যে ক্যাম্পে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে তিনি গিয়েছিলেন, ২০২৪ সালে সেই একই অঞ্চলে আরাকান আর্মির সঙ্গে সংঘর্ষের মুখে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী ও নিরাপত্তা বাহিনীর কয়েক শ সদস্য বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এটি শুধু একটি সামরিক ঘটনা নয়—এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায় রাখাইনে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের কাঠামো কতটা বদলে গেছে।

বর্তমান রাখাইনের পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে আরাকান আর্মি। ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত সংগঠনটি ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর দ্রুত ভূখণ্ডগত নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে। তাদের রাজনৈতিক শাখা ইউনাইটেড লিগ অব আরাকান (ইউএলএ) প্রশাসন, বিচার, নিরাপত্তা ও স্থানীয় শাসনের কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করছে, ফলে তারা এখন ডি-ফ্যাক্টো রাজনৈতিক ও সামরিক কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এখানে বড় প্রশ্ন—এই নতুন ব্যবস্থায় রোহিঙ্গাদের স্থান কোথায়? হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও ওএইচসিএইচআরসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রিত এলাকায় রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে হত্যা, আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ, জোরপূর্বক শ্রম ও সম্পত্তি ধ্বংসের অভিযোগ এসেছে, যদিও ইউএলএ/এএ এসব অভিযোগের কিছু অস্বীকার করেছে। অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্যের মাঝেও একটি বিষয় পরিষ্কার—রাখাইনে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা এখনো নিশ্চিত হয়নি।

বাংলাদেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখ ২ হাজার ৩৪ (৩১ জুলাই ২০২৬-এর তথ্য)। এত বড় জনগোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান মানবিক সমস্যার পাশাপাশি শিক্ষা, কর্মসংস্থান, মানব পাচার, মাদক, অপরাধ ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাবের মতো বিষয়ও যুক্ত করেছে। রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান অবশ্যই স্বেচ্ছামূলক, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন। কিন্তু যে মংডু ও উত্তর রাখাইনে অধিকাংশ রোহিঙ্গার ফিরে যাওয়ার কথা, তার বড় অংশ এখন মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই—সেখানে ইউএলএ/এএ কার্যকর কর্তৃপক্ষ। ফলে বাংলাদেশের সামনে দ্বৈত বাস্তবতা সৃষ্টি হয়েছে: একদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাষ্ট্রীয় পক্ষের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া চলছে, অন্যদিকে প্রত্যাবাসন এলাকার বাস্তব নিয়ন্ত্রণ অন্য শক্তির হাতে। এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে টেকসই প্রত্যাবাসন সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি।

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের করণীয় হিসেবে তিনি চারটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন। প্রথমত, মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে হবে, পাশাপাশি সীমান্তের বিপরীতে বাস্তব নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকারী শক্তির সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগের পথ রাখা দরকার—এটিকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হিসেবে না দেখলেও সীমান্ত নিরাপত্তা, মানবিক প্রবেশাধিকার ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাবাসনের জন্য বাস্তব প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করতে হবে, যাতে বাংলাদেশের ভূখণ্ড বা রোহিঙ্গা ক্যাম্প কোনো সশস্ত্র সংগঠনের প্রশিক্ষণ, নিয়োগ বা আন্তসীমান্ত তৎপরতার ভিত্তি হতে না পারে। তৃতীয়ত, প্রত্যাবাসনকে শুধু সংখ্যার হিসাব হিসেবে না দেখে ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার, চলাচলের স্বাধীনতা, জীবিকা, শিক্ষা ও জমির অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, চীন, ভারত, আসিয়ান ও জাতিসংঘকে আরও কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে এবং রোহিঙ্গা সংকটকে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার বিষয় হিসেবে তুলে ধরতে হবে। সবশেষে, বাংলাদেশের একটি দীর্ঘমেয়াদি রাখাইন–রোহিঙ্গা–বর্ডার স্ট্র্যাটেজি প্রয়োজন, যেখানে পররাষ্ট্রনীতি, সীমান্ত নিরাপত্তা, গোয়েন্দা মূল্যায়ন, মানবিক নীতি ও আঞ্চলিক কূটনীতি সমন্বিত হবে এবং সশস্ত্র বাহিনীকে অবশ্যই ডেটারেন্স অর্জন করতে হবে।

২০০৮ সালে মংডুর বাইরে দেখা সবুজ ধানখেত, দূরের মায়ু পাহাড় আর ছোট ছোট গ্রামের স্মৃতি এখনো তার মনে আছে। আজ সেই ভূখণ্ড দীর্ঘ সংঘাতের ক্ষত বহন করছে। যে সীমান্তরক্ষীদের সঙ্গে পতাকা বৈঠক হয়েছে, তাদের কর্তৃত্ব অনেকাংশে বিলীন; যে রোহিঙ্গা ব্যবসায়ীকে প্রতিষ্ঠিত অবস্থায় দেখা গিয়েছিল, তাকে শরণার্থী ক্যাম্পে নিঃস্ব অবস্থায় দেখেছেন; আর যে আরাকান আর্মি ২০০৮ সালে কার্যত অদৃশ্য ছিল, আজ তারা রাখাইনের প্রধান সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি। তবে রাখাইনের গল্পকে জয়-পরাজয়ের দৃষ্টিতে না দেখে সবচেয়ে বেশি মূল্য দিয়েছে সাধারণ মানুষ—রোহিঙ্গা, রাখাইন ও অন্যান্য জনগোষ্ঠী। একটি জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা যদি আরেকটি জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তাহীনতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে স্থায়ী শান্তি সম্ভব নয়। বাংলাদেশের জন্যও শিক্ষা পরিষ্কার—রাখাইন এখন কেবল রোহিঙ্গা শরণার্থীর উৎস নয়, এটি সীমান্ত নিরাপত্তা, বঙ্গোপসাগরীয় ভূরাজনীতি, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত কৌশলগত অঞ্চল। শুধু যুদ্ধ থামলেই শান্তি আসবে না; প্রয়োজন রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, সব জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, পারস্পরিক আস্থা ও বাস্তবসম্মত আঞ্চলিক কূটনীতি।