বলিউড ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রে নন্দিতা দাসের পরিচিতি কেবল একজন অভিনেত্রী হিসেবে নয়, বরং একজন সাহসী নির্মাতা এবং নিবেদিত মানবাধিকারকর্মী হিসেবে। ১৯৬৯ সালের ৭ নভেম্বর জন্মগ্রহণকারী এই শিল্পী আজ ৫৭ বছর পূর্ণ করলেন। দীর্ঘ তিন দশকের অভিনয়জীবনে তিনি ১০টি ভিন্ন ভাষায় ৪০টিরও বেশি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। মৃণাল সেন, শ্যাম বেনেগাল এবং মণি রত্নমের মতো প্রথিতযশা পরিচালকদের সাথে কাজ করা এই শিল্পী সমাজকর্মে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী, যার কাছে চলচ্চিত্র হলো নিজের ভাবনা ও সামাজিক প্রশ্নগুলো মানুষের সামনে উপস্থাপনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম।

নন্দিতার অভিনয় জীবনের কথা উঠলে দীপা মেহতার ‘ফায়ার’ (১৯৯৬) ছবির কথা মনে পড়ে, যেখানে সীতা চরিত্রের মাধ্যমে তিনি নারীর আকাঙ্ক্ষা ও পারিবারিক বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছিলেন। পরবর্তীতে ‘আর্থ’ সিনেমায় দেশভাগের বিভীষিকা এবং ধর্মীয় বিদ্বেষের প্রভাব ফুটিয়ে তোলেন। রাজস্থানি প্রেক্ষাপটে নির্মিত ‘বাওয়ান্ডার’ ছবিতে ধর্ষণের শিকার এক নারীর ন্যায়বিচারের লড়াইয়ে তাঁর অভিনয় ছিল অত্যন্ত বাস্তবসম্মত, যা তাঁকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুললেও দর্শকদের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। বাংলা চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে মৃণাল সেনের ‘আমার ভুবন’ ছবির জন্য তিনি কায়রো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পান। এছাড়া ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘শুভ মহরত’ এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সাথে ‘পদক্ষেপ’ ছবিতেও তাঁর কাজ স্মরণীয় হয়ে আছে।

অভিনয়ের পাশাপাশি ক্যামেরার পেছনেও নন্দিতা দাসের যাত্রা অত্যন্ত প্রভাবশালী। ২০০৮ সালে তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ফিরাক’ মুক্তি পায়, যার পটভূমি ছিল গুজরাটের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পরবর্তী মানসিক ট্রমা। এরপর ২০১৮ সালে তিনি উর্দু লেখক সা’দত হাসান মান্টোর জীবন অবলম্বনে ‘মান্টো’ নির্মাণ করেন, যা কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়। তাঁর তৃতীয় ছবি ‘জুইগাটো’র মাধ্যমে তিনি শহরের অ্যাপ-ভিত্তিক ডেলিভারি কর্মীদের অনিশ্চিত জীবন ও সংগ্রামের কথা তুলে ধরেছেন। এই ছবিটির ভাবনা তিনি অতিমারি চলাকালীন সময়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে পান। ২০১৬ সালে তিনি ‘নন্দিতা দাস ইনিশিয়েটিভস’ প্রতিষ্ঠা করেন, যার মাধ্যমে তিনি স্বাধীনভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণ ও সামাজিক প্রকল্পের কাজ পরিচালনা করেন।

সামাজিক সচেতনতায় তাঁর অবদান কেবল সিনেমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। গায়ের রং নিয়ে বৈষম্যের বিরুদ্ধে ‘ডার্ক ইজ বিউটিফুল’ প্রচারণা এবং লকডাউনে নারীদের ওপর পারিবারিক সহিংসতা নিয়ে তৈরি স্বল্পদৈক্ষিক কাজ ‘লিসেন টু হার’ এর মাধ্যমে তিনি প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন। বাংলাদেশের সাথেও তাঁর নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে; তিনি একাধিকবার ঢাকায় মঞ্চনাটক এবং সাহিত্য উৎসবে অংশগ্রহণ করেছেন। বিশেষ করে ঢাকা লিট ফেস্টে ‘মান্টো’ প্রদর্শন এবং বাংলাদেশে ‘সুন্দর মানে ফরসা নয়’ উদ্যোগের কথা জেনে তিনি বিশেষ আনন্দ প্রকাশ করেছেন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নন্দিতা দাসের অর্জন ঈর্ষণীয়। ফরাসি সরকারের ‘নাইট অব দ্য অর্ডার অব আর্টস অ্যান্ড লেটার্স’ সম্মাননা পাওয়ার পাশাপাশি তিনি ইয়েল ওয়ার্ল্ড ফেলো হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এছাড়া কান, কার্লোভি ভেরি এবং সান সেবাস্তিয়ান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মতো মর্যাদাপূর্ণ আসরে তিনি বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সম্প্রতি ২০২৫ সালের বুসান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ৩০তম আসরেও তিনি বিচারকমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন।

বর্তমানে নন্দিতা তাঁর চতুর্থ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যেখানে তিনি বিয়ে, বিচ্ছেদ ও মাতৃত্বের মতো অত্যন্ত ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিলতাগুলো বিশ্লেষণ করতে চান। এবারের ছবিতে তিনি অর্থসংস্থানের দায়িত্ব নিজেই নিচ্ছেন, যাতে দর্শক ও চলচ্চিত্রের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারেন। প্রথা ও আধুনিকতার দ্বন্দ্বে মানুষ কীভাবে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখে, তা হবে তাঁর নতুন সৃষ্টির মূল উপজীব্য।