বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের ৪৫তম ব্যাচের চূড়ান্ত নিয়োগপ্রক্রিয়া আবারও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, ইতোমধ্যে একটি গোয়েন্দা সংস্থার জমা দেওয়া যাচাই প্রতিবেদন পুনরায় অন্য একটি সংস্থার মাধ্যমে করানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই জোড়া যাচাইয়ের কারণে চলতি আগস্ট মাসের মধ্যেও প্রার্থীদের চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কোঠায়। শুধু ৪৫তম নয়, একই জটিলতায় আটকে আছে ৪৬তম ও ৪৯তম (বিশেষ) বিসিএসের নিয়োগও। আগস্ট মাস প্রায় শেষ হতে চললেও প্রজ্ঞাপনের কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ এখনো জানা যায়নি।
এই দীর্ঘ অপেক্ষার মাঝেই সুপারিশপ্রাপ্ত দুই প্রার্থীর করুণ পরিণতি সামনে এসেছে। কৃষি ক্যাডারে নির্বাচিত মীর তানভীর আহমেদ গত ১৮ আগস্ট নীলফামারীতে ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যুবরণ করেন। মাদারীপুরের এই যুবক শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে নতুন কর্মজীবনের অপেক্ষায় ছিলেন। তাঁর পরিবারের আশা ছিল, চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পর তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেবেন। কিন্তু সেই দিনটি তাঁর জন্য আসেনি।
একইভাবে লাইভস্টক ক্যাডারে সুপারিশ পাওয়া মুমতাহিনা মিমুও পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন। হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ছাত্রী ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে গত ১৭ জুলাই মারা যান। তানভীর ও মিমু—দুজনের নামই এখনো ৪৫তম বিসিএসের তালিকায় উজ্জ্বল, কিন্তু চাকরিতে যোগদানের সুযোগ তাঁদের হয়নি।
এই বিসিএসে ক্যাডার পদে মোট ১ হাজার ৮০৭ জনকে সুপারিশ করা হয়েছিল। পিএসসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ৩০ নভেম্বর আবেদন গ্রহণের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়ায় ২০২৩ সালের মে মাসে প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় ১২ হাজার ৭৮৯ জন, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে লিখিত পরীক্ষায় ৬ হাজার ৫৫৮ জন উত্তীর্ণ হন। এরপর ২০২৫ সালের নভেম্বরে চূড়ান্ত ফল প্রকাশিত হয়। কিন্তু নয় মাস পেরিয়েও সেই ফলের ভিত্তিতে গেজেট জারি হয়নি।
প্রার্থীদের ব্যক্তিগত জীবনে এই বিলম্বের গভীর প্রভাব পড়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সুপারিশপ্রাপ্ত জানান, নতুন চাকরির প্রত্যাশায় তিনি পূর্বের কর্মস্থল ছেড়ে দিয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, প্রায় চার বছরের এই ঝুলন্ত প্রক্রিয়ায় সঞ্চিত অর্থ শেষ হয়ে গেছে এবং মানসিকভাবে তিনি ভেঙে পড়েছেন। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের আরেক প্রার্থী জানান, তাঁর শিক্ষার খরচ জোগাতে বাবা পরিবারের শেষ জমি বিক্রি করেছিলেন। সামাজিক পরিচিতি মিললেও বাস্তব জীবনে তিনি চরম অর্থকষ্টের মুখোমুখি। তাঁর পরিবারের সব ভরসা এখনো এই নিয়োগের ওপর টিকে আছে।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী গত ৩০ জুলাই জানিয়েছিলেন, আগস্ট মাসের মধ্যেই সব যাচাই সম্পন্ন করে গেজেট প্রকাশের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার। কিন্তু মাসের শেষ সপ্তাহে এসে নতুন যাচাইয়ের সিদ্ধান্তের কথা জানা যাচ্ছে। এ বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য জানতে রোববার তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।
প্রায় চার বছরের একটি নিয়োগপ্রক্রিয়া কেন এখনো সম্পন্ন হলো না এবং পুনরায় যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা কী—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। ৪৫তম বিসিএসের ১ হাজার ৮০৭ জন প্রার্থী এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তাঁদের মেধার স্বীকৃতি ও সুপারিশ রয়েছে, তবে চাকরিতে যোগদানের চূড়ান্ত নিশ্চয়তা এখনো দূরের বিষয়। সংশ্লিষ্টদের জোর দাবি, পুনরায় যাচাই দ্রুত শেষ করে অবিলম্বে প্রজ্ঞাপন জারি করা হোক।




