বর্তমান যুগের তেলাপোকা বা পিঁপড়ের শরীর ছয়টি পায়ে ভর করে চলেলেও, কোটি কোটি বছর আগে তাদের পূর্বপুরুষদের পা ছিল ২৪টি। এক বিস্ময়কর আবিষ্কারের মাধ্যমে পতঙ্গদের বিবর্তনের ইতিহাস নতুন করে লিখছেন বিজ্ঞানীরা। এই যুগান্তকারী গবেষণার সূত্রপাত হয় অত্যন্ত সাধারণ একটি মাধ্যম থেকে—ইবে (eBay) থেকে কেনা একটি পুরোনো রুশ পাঠ্যবই।

কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির জীবাশ্মবিজ্ঞানের পিএইচডি গবেষক এরিক তিহেলকা ওই পুরোনো বইয়ের পাতায় একটি সাদাকালো স্কেচ লক্ষ্য করেন। বইটিতে দাবি করা হয়েছিল, এটি প্রায় ৩২ কোটি ৪০ লাখ বছর আগেকার এক জলজ ক্রাস্টাসিয়ান (কাঁকড়া বা চিংড়ি জাতীয়) প্রাণীর জীবাশ্ম। তবে এরিকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ধরা পড়ে অন্য কিছু। তিনি লক্ষ্য করেন, প্রাণীটির শরীর আধুনিক সিলভারফিশ পোকার মতো তিনটি অংশে বিভক্ত এবং মাথায় অ্যান্টেনা রয়েছে। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় ছিল এর পায়ের সংখ্যা; আধুনিক পতঙ্গের ছয়টি পায়ের বদলে এর শরীরে ছিল মোট ২৪টি পা।

বিজ্ঞানীদের জানা ছিল যে, পতঙ্গরা মূলত জলজ ক্রাস্টাসিয়ান থেকেই বিবর্তিত হয়ে ডাঙায় এসেছে। তবে ৩৮ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৩২ কোটি ২০ লাখ বছর আগের সেই সন্ধিক্ষণের কোনো প্রমাণ মেলেনি, যাকে জীবাশ্মবিজ্ঞানে 'হেক্সাপড গ্যাপ' বলা হয়। এই নিখোঁজ সময়কালেরই একটি নিখুঁত প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায় ওই রুশ বইয়ের স্কেচটি, কারণ ওই জীবাশ্মটির বয়স ছিল ৩২ কোটি ৪০ লাখ বছর।

প্রমাণের সন্ধানে এরিক তিহেলকা যুক্তরাষ্ট্রে যান। টেক্সাস থেকে উদ্ধার হওয়া আসল জীবাশ্মটি ১৯৮৫ সাল থেকে সান ডিয়েগো ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে সংরক্ষিত ছিল। আধুনিক মাইক্রোস্কোপ এবং লাইট পোলারাইজেশন ফিল্টার ব্যবহার করে পরীক্ষা করে তিনি নিশ্চিত হন যে, এটি কোনো সাধারণ জলজ প্রাণী নয়, বরং একটি আদিম পতঙ্গ। এর অতিরিক্ত পাগুলো ছিল জলজ পূর্বপুরুষদের বংশগত বৈশিষ্ট্য।

গবেষকরা এই প্রাণীটির নাম দিয়েছেন 'চোশা প্রিকার্সর'। ডিনে বা নাভাজো আদিবাসীদের ভাষায় 'চোশা' শব্দের অর্থ পতঙ্গ। এই প্রাণীটির শারীরিক গঠন জল থেকে ডাঙায় ওঠার এক অনন্য রূপান্তর প্রকাশ করে। এর নিচের দিকের চ্যাপ্টা পাগুলো সাঁতার কাটতে সাহায্য করত, আর মাঝখানের ছয়টি শক্ত পা ছিল ডাঙায় হাঁটাচলার জন্য।

'নেচার' জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণার পর বিজ্ঞানীরা স্কটল্যান্ড ও ইলিনয়ের জাদুঘরে থাকা আরও কিছু পুরোনো জীবাশ্ম পুনরায় পরীক্ষা করেন। এতে দেখা যায়, ৪০ কোটি ৫ লাখ বছর আগের স্কটিশ জীবাশ্ম 'লেভারহুলমিয়াও'-এরও অতিরিক্ত পা ছিল। হার্ভার্ড মিউজিয়ামের পেলিওবায়োলজিস্ট রিচার্ড জে. নেক্টের মতে, ৪০ বছর ধরে ভুল পরিচয়ে থাকা একটি জীবাশ্ম নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে বিজ্ঞানের ইতিহাস বদলে দিয়েছে, যা সত্যিই অভাবনীয়।