বিদ্যালয়ে আমরা খাদ্যশৃঙ্খল বা ফুড চেইনের যে প্রাথমিক ধারণা পাই, বাস্তব প্রকৃতিতে তা অনেক বেশি জটিল। সাধারণ ধারণায় ইঁদুর ফসল খায়, সাপ ইঁদুরকে এবং ইগল সাপকে শিকার করে। কিন্তু এই সরল হিসাবের বাইরেও রয়েছে পরজীবীর প্রভাব এবং মৃতভোজী প্রাণীদের ভূমিকা, যা প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে। আগে এই জটিল সম্পর্কের তথ্য সংগ্রহ করতে গবেষকদের দীর্ঘ সময় মাঠে কাটাতে হতো, এমনকি প্রাণীর মলের মতো দুর্গন্ধযুক্ত নমুনা সংগ্রহ করে শিকারি প্রাণীর খাদ্যাভ্যাস বিশ্লেষণ করতে হতো।

তবে বর্তমানে এই গবেষণার পদ্ধতিতে এসেছে আমূল পরিবর্তন। নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক ব্র্যাডলি আলফ তৈরি করেছেন ‘হু ইটস হুম’ (Who Eats Whom) নামক একটি প্ল্যাটফর্ম। এখানে ‘আই-ন্যাচারালিস্ট’ সামাজিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ বিভিন্ন প্রাণীর ছবি এবং তাদের ভৌগোলিক অবস্থান (জিওট্যাগ) আপলোড করে দিচ্ছেন। এই জন-অংশগ্রহিত প্রকল্পের ফলে ১০০টির বেশি দেশের ৫ হাজার ৭০০ প্রজাতির প্রায় ১৭ হাজার খাদ্যাভ্যাসের তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে, যা একজন গবেষকের পক্ষে একা অর্জন করা প্রায় অসম্ভব ছিল।

গবেষক অদিতি মল্লাভারাপু উল্লেখ করেছেন যে, গত পাঁচ বছরে প্রাণীদের খাদ্যাভ্যাসে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। এই বিশাল তথ্যের ভাণ্ডার বিশ্বজুড়ে বাস্তুসংস্থানের পরিবর্তন বুঝতে সাহায্য করছে। উদাহরণস্বরূপ, ওই প্ল্যাটফর্মের ‘ইন্টারঅ্যাকটিভ ফুড ওয়েব’ থেকে জানা যায়, লাল-লেজযুক্ত বাজপাখি ছোট স্তন্যপায়ী ও রবিন পাখি শিকার করে, আবার রবিন পাখি ফল বা পাতা খায়। অন্যদিকে, গোল্ডেনরড ক্র্যাব স্পাইডার মৌমাছি শিকার করে। এমনকি নিউ ওয়ার্ল্ড শকুন কর্তৃক মৃত সাদা হাঙরের দেহ ভক্ষণের মতো বিরল দৃশ্যও এখানে ধরা পড়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবী উত্তপ্ত হওয়ায় অনেক প্রাণী শীতল মেরু অঞ্চলের দিকে সরে যাচ্ছে, যার ফলে তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের ধরন বদলে যাচ্ছে। ক্যালিফোর্নিয়া একাডেমি অব সায়েন্সেসের গবেষক পিটার রূপনারাইন মনে করেন, প্রকৃতির অগণিত প্রজাতি ও তাদের মধ্যকার সম্পর্কগুলো অত্যন্ত জটিল এবং অনেক ঘটনা মুহূর্তের মধ্যে ঘটে যায়, তাই সাধারণ মানুষের মাধ্যমে এই তথ্য সংগ্রহ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জের সমাধান।

পরিবেশবিদদের মতে, কে কাকে শিকার করছে তা নিখুঁতভাবে জানতে পারলে বিপন্ন প্রজাতি রক্ষার কার্যকর উপায় বের করা সম্ভব হবে। এছাড়া বহিরাগত আক্রমণাত্মক প্রজাতিগুলো স্থানীয় বাস্তুসংস্থানের যে ক্ষতি করছে, তা শনাক্ত করতেও এই তথ্যগুলো জরুরি। ক্যালিফোর্নিয়া একাডেমি অব সায়েন্সেসের পরিচালক রেবেকা জনসন জানান, এটি সাধারণ মানুষের জন্য একটি রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা, যা তাদের প্রকৃতিকে নতুন দৃষ্টিতে দেখতে শেখায়। গবেষকদের মতে, প্রজাতি রক্ষা করতে কেবল নির্দিষ্ট বন বা সমুদ্র সংরক্ষণ যথেষ্ট নয়, বরং মাংসাশী, সর্বভুক ও তৃণভোজী প্রাণীদের পারস্পরিক খাদ্য-সম্পর্কগুলো টিকিয়ে রাখা অপরিহার্য।