মার্কিন জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো খাতে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় পাঁচ লাখ অতিরিক্ত কর্মীর চাহিদা তৈরি হবে বলে গোল্ডম্যান স্যাকসের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন সতর্ক করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিস্তারের ফলে বিদ্যুৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এই ঘাটতি আরও প্রকট হতে পারে। তবে প্রশিক্ষণের দীর্ঘ সময় এবং পর্যাপ্ত নতুন কর্মী প্রবেশের অভাবে শ্রম সরবরাহের এই সংকট কাঠামোগত রূপ নিচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, সংশ্লিষ্ট পদগুলোতে সাধারণত তিন থেকে চার বছরের প্রশিক্ষণ লাগে। ২০২৪ সালে জ্বালানি খাতের শিক্ষানবিশ কর্মসূচিতে মাত্র ৪৫ হাজার জন প্রবেশ করেছে, যেখানে বার্ষিক অন্তত ৬৫ হাজার পেশাদার প্রয়োজন। ফলে প্রশিক্ষণের গতি বিনিয়োগের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। "বিদ্যুৎ সরবরাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে—কিন্তু এখন প্রয়োজনীয় শ্রমশক্তিও নিজস্ব কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা তৈরি করছে," প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। নির্মাণ, তার সংযোগ, শীতলীকরণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের জন্য যে কারিগরি কর্মীবাহিনী প্রয়োজন, তা তীব্র চাহিদার মুখে রয়েছে।
২০২৪ সাল পর্যন্ত এই খাতে প্রায় ৮৫ লাখ মানুষ কর্মরত ছিলেন, যাদের বার্ষিক মধ্যম বেতন ছিল ৫৮ হাজার ৮১০ ডলার। তবু আরও লাভজনক সুযোগ রয়েছে—প্রচলিত জ্বালানি উৎপাদনে গড় বেতন ৬৫ হাজার ৪০০ ডলার এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিচালনাকারীদের বেতন বছরে প্রায় এক লাখ তিন হাজার ৬০০ ডলার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই কাজগুলোর জন্য ব্যয়বহুল বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি প্রায়শই প্রয়োজন হয় না; বরং বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ ও কর্মক্ষেত্রে অর্জিত অভিজ্ঞতাই প্রধান।
অন্যদিকে, মার্কিন উৎপাদন খাতেও পদ ও কর্মীর সংখ্যার ভারসাম্যহীনতা রয়েছে; সামগ্রী পরিচালনার এক মিলিয়নের বেশি পদ বর্তমানে শূন্য। তবে কর্মী সরবরাহ যদি চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে না পারে, তাহলে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি ও মানবসদৃশ রোবট দিয়ে ঘাটতি পূরণের পথ খুলে যেতে পারে। গোল্ডম্যান স্যাকসের বিনিয়োগ গবেষণা অনুযায়ী, মানবসদৃশ রোবটের বাজার ২০২৫ সালের ২০ হাজার থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৪ লাখে পৌঁছাবে—অর্থাৎ এক দশকে প্রায় ৬,৯০০ শতাংশ বৃদ্ধি। চীনের এআই উন্নয়নকারী ইউনিট্রি ও ইউবিটেক ইতিমধ্যে এগিয়ে রয়েছে এবং ২০২৭ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে বাণিজ্যিক বিস্তার প্রত্যাশিত।
ইতিমধ্যে অন্যান্য স্বয়ংক্রিয় সরঞ্জাম কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে। জন ডিয়ারের ক্ষেত্র ব্যবস্থা ও ক্যাটারপিলারের খনি প্ল্যাটফর্ম তার উদাহরণ। চলতি বছরের শুরুতে অ্যামাজন তার স্বয়ংক্রিয় মোবাইল গুদাম রোবট ‘প্রোটিয়াস’ উন্মোচন করে। বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা টেসলা নিজের কারখানায় ‘অপ্টিমাস’ নামের মানবসদৃশ রোবট ব্যবহার করে প্রাথমিক কারখানা কাজ ও সংযোজন লাইনের দায়িত্ব অর্পণ করেছে।
তবে ইস্পাতের পা ও নিরাকার মুখের এই রোবটগুলো শিগগিরই কারখানার লাইনে ব্যাপকভাবে নামবে না। রোবট ও কারখানা নির্মাণে বছরের পর বছর লাগে এবং প্রচুর অর্থায়নের প্রয়োজন। বেসরকারি ইকুইটি ফার্ম ও ব্যাংকগুলোর কাছে এই প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য পর্যাপ্ত ঐতিহাসিক আর্থিক তথ্য নেই। কোম্পানিগুলোও বড় পরিসরে মানবসদৃশ যন্ত্র কীভাবে ব্যবহার করবে, তা এখনো নির্ধারণ করতে পারেনি। ফলে রোবটের দল মাঠে নামার জন্য আরও কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে।
অন্যদিকে, চীনের জ্বালানি খাত ইতিমধ্যে রোবট মোতায়েনে এগিয়ে। ২০২২ সালে উহান প্রদেশে একটি রোবট রক্ষণাবেক্ষণ পেশাদারের কাজ সম্পন্ন করে বিদ্যুৎ লাইনের মেরামত করেছিল। গুয়াংঝুর একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে মানবসদৃশ সহায়করা ইতিমধ্যে পরিদর্শনের কাজ গ্রহণ করেছে, যা সাধারণত কর্মীদের দ্বারা সম্পন্ন হতো। চলতি বছরের শুরুতে চীন তার রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ গ্রিড করপোরেশনের মাধ্যমে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের পরিদর্শন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রায় ৮,৫০০টি এআই-চালিত রোবট মোতায়েনের লক্ষ্যে এক বিলিয়ন ডলারের উদ্যোগ ঘোষণা করে।
বার্কলেসের থিমেটিক গবেষণা প্রধান জোর্নিৎসা তোদোরোভা পূর্বাভাস দেন, বর্তমানে প্রায় তিন বিলিয়ন ডলারের মানবসদৃশ বাজার ২০৩৫ সালের মধ্যে ২০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হতে পারে। এনভিডিয়ার প্রধান জেনসেন হুয়াং মনে করেন, এই প্রযুক্তির প্রকৃত উন্মোচন এখনও কয়েক বছর দূরে। "আমরা একটি রূপান্তরের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি, মানবসদৃশ রোবট কী করতে পারে তার কেবল পৃষ্ঠ স্পর্শ করছি," তোদোরোভা বলেন। প্রযুক্তি পরিপক্ক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও সেবামুখী ভূমিকায় এর ব্যাপক প্রয়োগ দেখা যাবে বলে তিনি মনে করেন।
এই পরিস্থিতিতে শ্রমবাজারের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি একসঙ্গে কাজ করছে। বিনিয়োগ ও প্রশিক্ষণের গতি বাড়াতে না পারলে, মার্কিন জ্বালানি খাতের সম্প্রসারণ শুধু মানবশ্রমের অভাবেই থমকে যেতে পারে—অথবা যন্ত্রের হাতেই সেই দায়িত্ব স্থানান্তরিত হতে পারে।




