জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর মিরপুরে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হওয়া শাকিল আহমেদ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ নিজের করুণ শারীরিক অবস্থার কথা বর্ণনা করেছেন। রোববার দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি জানান, দেশে এবং বিদেশে মোট ১৪ বার অস্ত্রোপচার করা হলেও তিনি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি। বর্তমানে তাকে মলদ্বার প্রসারিত করার বিশেষ পদ্ধতি বা ডাইলেশনের মাধ্যমে প্রতিদিন মলত্যাগ করতে হয়। শারীরিক জটিলতার কারণে তিনি শক্ত খাবার খেতে পারেন না এবং সবসময় তরল খাবার গ্রহণ করতে হয়। এছাড়া মিষ্টিজাতীয় খাবার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ; চিকিৎসকদের মতে, ডায়াবেটিস হলে তার পা কেটে ফেলার আশঙ্কা রয়েছে।
শাকিল আহমেদ জানান, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট মিরপুর ১০ নম্বর এলাকায় আন্দোলনের সময় পুলিশ ও আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের লোকজনকে নির্বিচারে গুলি চালাতে দেখেন। এক গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিকে সাহায্য করতে গিয়ে তিনি নিজেও লক্ষ্যবস্তু হন এবং তার শরীরে গুলি লাগে। এরপর ৮ আগস্ট কল্যাণপুর ইবনে সিনা হাসপাতালে তার প্রথম পাঁচটি অস্ত্রোপচার হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয় মাস চিকিৎসা নেওয়ার পর চিকিৎসকদের পরামর্শে তিনি থাইল্যান্ডে যান, যেখানে আরও নয় বার অস্ত্রোপচার করা হয়। শাকিল ‘ক’ গেজেটভুক্ত একজন আহত জুলাই যোদ্ধা এবং ঘটনার সময় তিনি শ্যামলী আইডিয়াল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে করা এই মামলায় তিনি সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত হন। শাকিলের অভিযোগ, এই দুই ব্যক্তির কুপরামর্শের কারণেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কারফিউ জারি করেছিলেন, যা পুলিশ ও অঙ্গসংগঠনকে নির্বিচারে গুলি চালানোর সুযোগ করে দেয়। এদিন অভিযুক্ত আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমানকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
একই দিনে মানবতাবিরোধী অপরাধের অন্য একটি মামলায় মো. জাকির হোসেন জবানবন্দি দেন। ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও সাবেক মন্ত্রী কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে করা এই মামলায় জাকির জানান, ১৮ জুলাই আজিমপুরের মেয়র হানিফ জামে মসজিদের সামনে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সংগঠনের সন্ত্রাসীদের গুলিবর্ষণের প্রত্যক্ষদর্শী তিনি। তিনি অভিযোগ করেন, সাবেক মন্ত্রী কামরুল ইসলামের ‘পেটোয়া বাহিনী’র সদস্যরা পুলিশের সাথে থেকে গুলি চালিয়েছিল, যাতে খালেদ সাইফুল্লাহসহ অনেকে গুরুতর আহত হন। পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে তার ছেলের বন্ধু ইফতিকে ছাত্রলীগের ছেলেরা তুলে নিয়ে নির্মম নির্যাতন করে। এদিন আসামী মেনন ও কামরুলকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
অন্যদিকে, ২০১৫ সালে বরিশালের আগৈলঝাড়ায় টিপু হাওলাদার ও কবির মোল্লাকে ক্রসফায়ারে হত্যার মামলায় মো. শহিদুল ইসলাম জবানবন্দি দিয়েছেন। ট্রাইব্যুনাল-২-এ দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি জানান, তিনি ২০১৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বরিশাল জেলা পুলিশ লাইনসের মোটরযান শাখায় কর্মরত ছিলেন। ২০১৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তিনি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে জানতে পারেন যে, উজিরপুর থেকে দুই এএসআই-কে এনে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়েছে, যারা পরে টিপু হাওলাদার ও কবির মোল্লা হিসেবে পরিচিত হন।
এছাড়া, সাবেক সেনা কর্মকর্তা শেখ মামুন খালেদের বিরুদ্ধে গুমের ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ট্রাইব্যুনাল-২ আগামী ৬ ডিসেম্বর দিন ধার্য করেছে। রোববার তাকে আদালতে হাজির করা হয়েছিল।




