নিজের পছন্দের এলাকায় পছন্দমতো নকশার ফ্ল্যাট বা বাড়ি খুঁজে পাওয়ার পর সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় বাজেট। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একটি বাড়ি কিনতে গিয়ে জীবনের সমস্ত সঞ্চয় শেষ হয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সঞ্চয়ের সব অর্থ একবারে ব্যয় না করে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের 'হোম লোন' বা গৃহঋণের সহায়তা নেওয়া একটি বুদ্ধিমান সিদ্ধান্ত হতে পারে। এর মাধ্যমে ক্রেতারা তাদের সঞ্চিত অর্থের সঙ্গে ঋণের টাকা যোগ করে স্বপ্নের আবাসনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেন।
ছুটি রিসোর্ট কক্সবাজারের চিফ মার্কেটিং অফিসার গোলাম সারোয়ার জানান, বর্তমান সময়ে বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবার এবং তরুণ চাকরিজীবীদের মধ্যে হোম লোনের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা একবারে বিশাল অংকের টাকা বিনিয়োগ করার বদলে নিজেদের মাসিক আয় ও সামর্থ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দীর্ঘমেয়াদি কিস্তির মাধ্যমে সম্পদ গড়ে তুলতে আগ্রহী। এই সহজ অর্থায়নের সুযোগ ক্রেতাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। ফলে তারা বাজেটের সীমাবদ্ধতার কারণে ছোট ফ্ল্যাট বা নির্দিষ্ট এলাকায় আটকে না থেকে উন্নত সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন এবং দীর্ঘমেয়াদে মূল্য ধরে রাখবে এমন প্রজেক্ট বেছে নিতে পারছেন। এতে বর্তমান সামর্থ্যের পাশাপাশি ভবিষ্যতের প্রয়োজন ও সম্পদের মূল্য—উভয়টি বিবেচনা করা সম্ভব হয়।
তবে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে কেবল অর্থ পাওয়াটাই মুখ্য নয়, বরং এর সঙ্গে যুক্ত দীর্ঘমেয়াদি দায়, সুদ এবং মাসিক কিস্তির হিসাব করা অত্যন্ত জরুরি। একজন ব্যক্তি কত টাকা ঋণ পাবেন এবং কত বছরের জন্য পাবেন, তা নির্ভর করে তার বর্তমান আয়, সম্পত্তির মূল্য, বিদ্যমান আর্থিক দায় এবং ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট শর্তাবলির ওপর। তাই ঋণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাস্তবসম্মত হিসাব করা প্রয়োজন।
আর্থিক কাঠামোর কথা বললে, তৈরি বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনা এবং নিজস্ব জমিতে বাড়ি নির্মাণের অর্থায়নের প্রক্রিয়া ভিন্ন হয়। ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে সম্পত্তির মোট মূল্য এবং ক্রেতার নিজস্ব অংশের অর্থের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে নির্মাণ ব্যয় মেটানোর প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। ঋণের আবেদন করার আগে কোন ধরনের অর্থায়ন প্রয়োজন এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট শর্তাবলি ও জমির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনুমোদন যাচাই করে নেওয়া উচিত।
অনেকেই কেবল মাসিক কিস্তির কথা চিন্তা করেন, তবে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ এবং সুদের হার দেখা জরুরি। ঋণের মেয়াদ দীর্ঘ হলে মাসিক কিস্তির চাপ কমলেও মোট সুদের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া সুদের হার পরিবর্তনশীল হলে ভবিষ্যতে কিস্তির পরিমাণও পরিবর্তিত হতে পারে। তাই চুক্তির আগে এই বিষয়গুলো পরিষ্কারভাবে বুঝে নেওয়া আবশ্যক।
মাসিক আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ দীর্ঘ সময়ের জন্য কিস্তিতে আটকে যায়। তাই বর্তমানে কিস্তি দেওয়া সম্ভব হলেও ভবিষ্যতে পরিবারের ব্যয় বৃদ্ধি বা আয়ের পরিবর্তনের কথা মাথায় রাখতে হবে। বিশেষ করে বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে নির্মাণ সামগ্রীর দাম বৃদ্ধি বা শ্রমিকের খরচ বাড়লে প্রাথমিক বাজেটের চেয়ে ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। তাই ঋণের পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতির জন্য কিছু সঞ্চয় রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। এছাড়া রেজিস্ট্রেশন, কর, ইন্টেরিয়র এবং ইউটিলিটি সংযোগের মতো আনুষঙ্গিক খরচগুলোও বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
পরিশেষে, গৃহঋণ অর্থের ঘাটতি পূরণের কার্যকর মাধ্যম হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। বর্তমানে অনলাইন আবাসন মেলাগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্পের পাশাপাশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণের সুযোগ-সুবিধা তুলনা করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়ে উঠেছে। কারণ বাড়ির মালিকানার আনন্দ যেমন দীর্ঘস্থায়ী, ঋণ পরিশোধের প্রক্রিয়াটিও তেমনি দীর্ঘ বছরের হিসাব।




