মিয়ানমারের জান্তা-সমর্থিত সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে জাপানের রাজধানী টোকিওতে এক গোপন বৈঠকে মিলিত হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা। গত এক মাসের মধ্যে দুই পক্ষের মধ্যে এটি দ্বিতীয় আলোচনা। ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে ওয়াশিংটন নেপিডো সরকারের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখলেও, সাম্প্রতিক সময়ে পুনরায় যোগাযোগ বাড়ানোর পদক্ষেপ নিয়েছে। রয়টার্সকে দেওয়া তথ্যে তিনজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এই বৈঠকের কথা নিশ্চিত করেছেন, যাদের মধ্যে একজন মার্কিন কর্মকর্তা রয়েছেন। তবে গোপনীয়তার কারণে তাঁরা নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে রাজি হননি।
এর আগে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল। সেই বৈঠকে প্রধানত যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের লক্ষ্য করে পরিচালিত ‘স্ক্যাম সেন্টার’ বা প্রতারণা কেন্দ্রগুলো বন্ধ করা এবং এক মার্কিন ব্যবসায়ীর মুক্তির বিষয়টি গুরুত্ব পায়। টোকিওতে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক বৈঠকেও এই বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র দপ্তরের গোয়েন্দা ও গবেষণাবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইকেল ভ্যান্স এই আলোচনার নেতৃত্ব দেন এবং তাঁর সঙ্গে ১২ জনের বেশি মার্কিন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। তবে মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলের সদস্যদের নাম নিশ্চিত করা যায়নি। এই বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বিস্তারিত এড়িয়ে গিয়ে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তারা মিয়ানমারের সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ আগ্রহ রয়েছে মিয়ানমারের বিপুল পরিমাণ 'হেভি রেয়ার আর্থ' বা উচ্চপ্রযুক্তি পণ্যের বিরল খনিজ সম্পদের ওপর। বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং বায়ু বিদ্যুৎ টারবাইন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় এই খনিজগুলোর প্রবেশাধিকার নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এই খনিজগুলোর বড় অংশ বর্তমানে বিদ্রোহী জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকায় বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। এছাড়া এই খাতের প্রধান ক্রেতা চীন হওয়ায় বেইজিংয়ের প্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। লোই ইনস্টিটিউটের পরিচালক হান্টার মার্সটনের মতে, ওয়াশিংটন এখন মিয়ানমারকে সম্পূর্ণ লেনদেনভিত্তিক দৃষ্টিতে দেখছে এবং বিরল খনিজগুলোই তাদের প্রধান কৌশলগত লক্ষ্য।
অন্যদিকে, মার্কিন নাগরিকদের কোটি কোটি ডলার হাতিয়ে নেওয়া অনলাইন প্রতারণা কেন্দ্রগুলো বন্ধ করা ওয়াশিংটনের অন্যতম লক্ষ্য। গবেষকদের মতে, জান্তা-সমর্থিত মিলিশিয়াদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় এসব কেন্দ্র অবস্থিত এবং এর আয়ের একটি অংশ সামরিক বাহিনীর কাছে যায়। ফলে জান্তা সরকার এসব কেন্দ্র বন্ধে কতটা আন্তরিক তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে, যদিও তারা বহুজাতিক উদ্যোগে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গির অংশ হিসেবে সম্প্রতি জান্তা সেনাবাহিনীকে সহায়তার অভিযোগে অভিযুক্ত এক ব্যবসায়ীর মেয়ের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে সামরিক অভ্যুত্থানের নেতা মিন অং হ্লাইং এখনো মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন। মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং রোহিঙ্গা গণহত্যায় তাঁর ভূমিকার কারণে এই কঠোর অবস্থান বজায় রাখা হয়েছে।
এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় জাপানের ভূমিকাও লক্ষণীয়। টোকিওতে বৈঠকের আয়োজন ছাড়াও জাপান সম্প্রতি তাদের ভারপ্রাপ্ত দূতের মাধ্যমে জান্তা সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছে। যদিও জাপান আনুষ্ঠানিকভাবে এই সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি, তবে তারা তাদের নাগরিকদের সুরক্ষা এবং জাপানি কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষায় যোগাযোগ রাখছে। ২০২১ সালের আগে মিয়ানমারে ৪০০টির বেশি জাপানি কোম্পানি ছিল, যার মধ্যে প্রায় ৩০০টি এখনো সেখানে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। জাপানের ক্ষমতাসীন দলের সদস্য হিরোমিচি ওয়াতানাবেও সম্প্রতি নেপিডো সফর করে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা পুনরায় চালুর পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করেছেন।




