২০১৯ সালের ডিসেম্বরে গ্র্যামির মনোনয়ন প্রকাশের পর এক ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল, যেখানে এক ব্যক্তি তরুণী শিল্পীকে উদ্দেশ্য করে গালিগালাজ করেন। মাত্র ১৭ বছর বয়সী সেই শিল্পী বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলেন, আর বডিগার্ডরা তাকে দ্রুত গাড়িতে তুলে নিয়ে যান। ঠিক এক মাস পর ২০২০ সালের ২৬ জানুয়ারি, গ্র্যামির ৬২তম আসরে ইতিহাস সৃষ্টি করেন তিনি। 'অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার', 'রেকর্ড অব দ্য ইয়ার', 'সং অব দ্য ইয়ার' এবং 'বেস্ট নিউ আর্টিস্ট'—এই বিগ ফোর বিভাগে জয়লাভ করেন বিলি আইলিশ, যা গ্র্যামির ৬২ বছরের ইতিহাসে প্রথম। ভাই ফিনেস ও'কনেলের সঙ্গে যৌথভাবে আরও একটি গ্র্যামি জিতে মোট পাঁচটি পুরস্কার ঘরে তোলেন তিনি। সেদিন রাতে ইনস্টাগ্রামে পাঁচটি গ্র্যামি হাতে ছবি পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখেন, 'আই ডিজার্ভ দেম অল!'।
সম্প্রতি মার্কিন অভিনেত্রী অ্যামি পোলারের পডকাস্ট 'গুড হ্যাং'-এ এসে বিলি প্রকাশ করেন, তিনি ট্যুরেট সিনড্রোমে আক্রান্ত। ২৪ বছর বয়সী এই তারকা জানান, ক্যামেরার সামনে বা সাক্ষাৎকারের সময় নিজের রোগ লুকানোর চেষ্টা করেন তিনি। এক দশকের ক্যারিয়ারে অস্বাভাবিক শারীরিক নড়াচড়া ও আওয়াজের কারণে তার অনুরোধে বহু রেকর্ডেড সাক্ষাৎকারের অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে। নিজেকে 'এক্সট্রিমলি প্রাইভেট পারসন' হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন বিলি, আর এর পেছনে ট্যুরেট সিনড্রোমের ভূমিকা আছে বলে জানান। তিনি বলেন, যেটি আমাদের দুর্বলতা বা হীনম্মন্যতা, সেটিই আসলে সুপারপাওয়ার হয়ে উঠতে পারে—নিজের প্রচেষ্টায় বাধা অতিক্রম করে সেরা মানুষটি বের করে আনতে সাহায্য করে।
মাত্র ১১ বছর বয়সে বিলির ট্যুরেট সিনড্রোম ধরা পড়ে। ১৩ বছর বয়সে 'ওশান আইজ' প্রকাশের পর রাতারাতি তারকা হয়ে যান তিনি। পডকাস্টে তিনি জানান, প্রায়ই তার হাঁটু, কনুই বা হাত অস্বাভাবিকভাবে নড়াচড়া করে, অনেক সময় নিজের অজান্তেই ভাবনা বলে ফেলেন। দীর্ঘদিন মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে এখন অনেকটাই টিক দমন করতে পারেন। এই রোগের কারণেই তিনি এখন সহজে উত্তেজিত বা হতাশ হন না, জীবনের যেকোনো ঘটনা শান্তভাবে মেনে নিতে পারেন। তিনি বলেন, 'আমি আমার দুর্বলতাকে এভাবেই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি বানিয়ে নিয়েছি।'
এআই শিল্পীদের প্রতিস্থাপন করতে পারবে কি না—এমন প্রশ্নে বিলির মত, এআই গান লিখছে, কম্পোজ করছে, কিন্তু মানুষের তৈরি শিল্পের কদর সব সময় থাকবে। কারণ সেই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শিল্পীর ব্যক্তিগত ইতিহাস, অভিজ্ঞতা ও অনুভব, যার সঙ্গে মানুষ সহজেই সংযোগ স্থাপন করতে পারে। এই হিউম্যান কানেকশনই সত্যিকারের শিল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি বলে মনে করেন তিনি।
জাস্টিন বিবারের সঙ্গে বিলির সম্পর্ক ভিন্নমাত্রার। ২০১৯ সালে বিবার তার 'ব্যাড গাই' গানের রিমিক্সে অংশ নেন। ২০২৪ সালে 'হিট মি হার্ড অ্যান্ড সফট' ট্যুরে বিলি বলেন, বিবার তার জীবনের অনুপ্রেরণা এবং তিনি তাকে সব সময় ভালোবাসবেন। সম্প্রতি ২০২৬ সালের এপ্রিলে কোচেলা মিউজিক ফেস্টিভ্যালে বিবারের গানের সময় হেইলি বিবার বিলিকে মঞ্চে পাঠিয়ে দেন। বিবার যখন 'ওয়ান লেস লোননি গার্ল' গাইছিলেন, তখন মঞ্চে উঠে আবেগে কেঁদে ফেলেন বিলি, আর বিবার তাকে জড়িয়ে ধরেন। ভক্তরা এই মুহূর্তকে 'ফুল সার্কেল হিস্টোরিক্যাল মোমেন্ট' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, অল্প বয়সে খ্যাতির চাপ সামলানোর অভিজ্ঞতা থেকে বিবারের প্রতি সহানুভূতিশীল বিলি, এবং নিজের জীবনেও সেটা কাজে লাগিয়েছেন।
বিলির জেন্ডার-ফ্লুইড ফ্যাশন আধুনিক পপ সংস্কৃতিতে প্রভাবশালী। ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই তিনি ওভারসাইজড হুডি, ব্যাগি প্যান্টস, বড় জার্সি—এমন পোশাক পরেন যা নির্দিষ্ট জেন্ডারের ফ্যাশনের বাইরে। গার্ডিয়ানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, মানুষ যেন তাকে লিঙ্গ বা শরীর দিয়ে বিচার না করে, তিনি শুধু একজন মানুষ ও শিল্পী। গুচি, ব্যালেন্সিয়াগা, শ্যানেল, লুই ভুতোঁর অ্যান্ড্রোজাইনাস আউটফিট আর নিয়ন সবুজ, প্লাটিনাম ব্লন্ড—নানা হেয়ার কালার তার পরিচয়ের অংশ। ভোগের ফটোশুট বা মেট গালাতে নারীত্ব উদযাপন করলেও তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, এটি স্টাইলের পরিবর্তন নয়, বরং নিজেকে ভিন্নভাবে দেখার একটি উপায়।
সম্পদ নিয়ে বিলির দৃষ্টিভঙ্গি ব্যতিক্রমী। ইলন মাস্কসহ বিশ্বের ধনকুবেরদের তিনি প্রশ্ন করেন, এত টাকা দিয়ে কী করবেন? অতিরিক্ত সম্পদ রেখে বিপন্ন মানুষ ও প্রাণীদের জন্য ব্যয় করার আহ্বান জানান। নিজের দুই অস্কার ও ১০টি গ্র্যামি থাকা সত্ত্বেও তিনি ইচ্ছে করলেই কয়েক হাজার কোটি টাকার মালিক হতে পারতেন। 'হিট মি হার্ড অ্যান্ড সফট' ট্যুর থেকে ২৫০ মিলিয়ন ডলার আয় হলেও ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তার মোট সম্পদ মাত্র ৭০ মিলিয়ন ডলার। নিয়মিতভাবে নারী, শিশু, অভিবাসী, যুদ্ধশিশু ও প্রাণী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোতে শত শত কোটি টাকা দান করেন, কিন্তু এটাকে 'দান' বলতে রাজি নন তিনি—বরং এটা অন্যদের অধিকার বলে মনে করেন।
তার পোষা কুকুর শার্কের 'ঘেউ ঘেউ' ও 'গরগর' শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে 'অক্সিটোসিন' ও 'আই ডিডন্ট চেঞ্জ মাই নাম্বার' গানে, যাকে তিনি 'শার্কের সঙ্গে ডুয়েট' বলে অভিহিত করেছেন। মানসিক স্থিতিশীলতার পেছনে শার্কের বড় ভূমিকা আছে বলেও জানিয়েছেন। তরুণদের নিজের মতো হয়ে বেঁচে থাকা, সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে এগিয়ে চলা—একেই তিনি সত্যিকারের সফলতা হিসেবে দেখেন।




