বর্ষায় চট্টগ্রাম নগরীর প্রধান দুটি দুশ্চিন্তার নাম পাহাড়ধস আর জলাবদ্ধতা। প্রতিবছরই বৃষ্টিতে পাহাড়ের ঢাল থেকে মাটি সরে এসে প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটে থাকে। এই প্রেক্ষাপটে নগরের পাহাড়গুলোর ঢালে বিন্না বা ভেটিভার ঘাস লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছিল সিটি করপোরেশন। মাটির ক্ষয় রোধে এই ঘাসের কার্যকারিতা অসামান্য হওয়ায় গবেষক মহলে এটি 'জাদুর ঘাস' নামে পরিচিতি পেয়েছে। আট বছর আগে ২০১৮ সালে এই প্রকল্পের শুভ উদ্বোধন করতে চট্টগ্রামে এসেছিলেন থাইল্যান্ডের রাজকুমারী মহা চক্রী সিরিনধরন। তিনি নিজ হাতে বাটালি হিলের মিঠা পাহাড়ের পাদদেশে বিন্না ঘাসের চারা রোপণ করেন এবং ভেটিভার সেন্টার উদ্বোধন করেন। সেখানে প্রদর্শনী প্লট ও প্রশিক্ষণ শেডও নির্মাণ করা হয়েছিল। মূল পরিকল্পনা ছিল পরীক্ষা সফল হলে নগরের সব ক্ষয়প্রবণ পাহাড়ে এই ঘাস ছড়িয়ে দেওয়া হবে, কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন থাইল্যান্ডের সাইপাট্টানা ফাউন্ডেশনের সহযোগিতা নিয়েছিল। কারিগরি সহায়তায় ছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন পরিবেশমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, তৎকালীন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন এবং থাইল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত প্যানপিমন সোয়ানাপুগন্সসহ অন্যরা। ওই সময় পরিবেশমন্ত্রী প্রকল্পের জন্য দুই কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই অর্থ কখনো ছাড় পাওয়া যায়নি বলে সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
প্রাথমিকভাবে টাইগারপাস এলাকার বাটালি হিলের মিঠা পাহাড়ের পাদদেশে প্রদর্শনী প্লট তৈরি করা হয়েছিল। সেখানে ভেটিভার সেন্টার, প্রশিক্ষণ শেড এবং গবেষণার নানা অবকাঠামো স্থাপন করা হয়। এই পরীক্ষামূলক প্রকল্পে মোট ২৮ লাখ টাকা ব্যয় হয়, যার মধ্যে ২০ লাখ টাকা দিয়েছিল থাই সরকার এবং বাকি টাকা ছিল সিটি করপোরেশনের নিজস্ব তহবিলের। তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী লেফটেন্যান্ট কর্নেল মহিউদ্দিন আহমদের উদ্যোগে কাজটি শুরু হয়েছিল। কিন্তু ২০২১ সালে মেয়র ও প্রশাসনিক পদে রদবদল ঘটলে প্রকল্পটির প্রতি আগ্রহ কমে যায় এবং কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
ভেটিভার ঘাসের মূল বৈশিষ্ট্য তার দীর্ঘ ও শক্তিশালী শিকড়। চার থেকে ছয় মাসের মধ্যেই এর শিকড় মাটির ছয় থেকে দশ ফুট গভীরে প্রবেশ করতে পারে এবং মাটিকে আঁকড়ে ধরে রাখে। প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে বলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাহাড়, নদীর তীর ও বাঁধের ক্ষয় রোধে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে। সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, ভেটিভার সেন্টারের কার্যালয়টি থাকলেও সেখানে প্রকল্পের কোনো কাজ হচ্ছে না। ওই স্থানে এখন সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি রাখা হয়েছে। পাহাড়ের পাদদেশের একটি বড় অংশে গুদাম নির্মাণ করা হয়েছে, আরেকটি অংশে ফুলের চারা লাগানো হয়েছে। তবে ফাঁকে ফাঁকে কিছু বিন্না ঘাস এখনো টিকে আছে। প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত এক প্রকৌশলী জানান, পাহাড়ের যেসব অংশে বিন্না ঘাস ছিল, সেখানে পাহাড়ধসের প্রবণতা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। নগরের বিভিন্ন পাহাড়ে ঘাস লাগাতে তিন কোটি টাকার একটি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও তা অনুমোদন পায়নি।
এদিকে, বিন্না ঘাসের ব্যবহার নিয়ে সম্প্রতি নতুন করে আগ্রহ দেখাচ্ছে সরকার। নদীভাঙন, ভূমিক্ষয় ও মাটির ক্ষয় ঠেকাতে পরিবেশবান্ধব এই ঘাসের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। 'বিন্না ঘাস পলিসি ফর বাংলাদেশ' শীর্ষক সভায় পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি নদীর পাড়, বাঁধের ঢাল ও হাওরাঞ্চলে পরিকল্পিতভাবে বিন্না ঘাস রোপণের নির্দেশনা দেন। সেখানে বুয়েটের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম ঘাসটির উপকারিতা নিয়ে উপস্থাপনা করেন। সরকারের এই অবস্থানের পর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনও নতুন করে পরিকল্পনা করছে। প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমান জানান, প্রাথমিকভাবে নগরের ছয়টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় বেছে নিয়ে সেখানে পরীক্ষামূলকভাবে বিন্না ঘাস লাগানো হবে। ফলাফল ভালো এলে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য পাহাড়েও এই ঘাসের ব্যবহার সম্প্রসারিত হবে।




